07/18/2025
মুহাম্মাদ বিন কাসিমের বেদনাদায়ক পরিণতি
১৮ জুলাই, ৭১৫ খ্রিস্টাব্দ
ইসলামি ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক দিন। এই দিনে আমরা হারিয়েছিলাম এক তরুণ নায়ককে, যিনি ইসলামের পতাকা ভারতের সিন্ধু প্রদেশে প্রথমবারের মতো উত্তোলন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মুহাম্মাদ বিন কাসিম আস সাকাফি— শুধু একজন সেনাপতি নন, বরং এক আদর্শ, এক দিগ্বিজয়ী মহানায়ক। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি ছিলেন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের ভাতিজা ও জামাতা। এটাই যথেষ্ট ছিল খলিফা সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিকের রোষের শিকার হওয়ার জন্য।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু বিজয় করে ইসলামের দিগন্ত বিস্তৃত করেন। তাঁর সাহসিকতা, দূরদর্শিতা ও ন্যায়বিচার সিন্ধুর জনগণের হৃদয় জয় করেছিল। বিজিত জনপদে তিনি কোনও দমননীতি নয়, বরং সহানুভূতি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করেন।
৭১৪ সালে হাজ্জাজের মৃত্যুর পরের বছর খলিফা হন ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক। ওয়ালিদের মৃত্যুর পর তার ভাই সুলাইমান খিলাফতের মসনদে বসেন। কিন্তু হাজ্জাজ ছিলেন ওয়ালিদের একান্ত বিশ্বস্ত ও সমর্থক, এবং ভবিষ্যৎ খলিফা নির্বাচনেও তাঁর ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। এ কারণেই সুলাইমানের হৃদয়ে জন্ম নেয় হাজ্জাজের প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ।
সুলাইমান প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন হাজ্জাজের সমস্ত ঘনিষ্ঠ সেনাপতি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। একে একে সবাইকে পদচ্যুত করা হয়। এরই অংশ হিসেবে মধ্য এশিয়া বিজয়ী কুতাইবা বিন মুসলিম ও সিন্ধু বিজয়ী মুহাম্মাদ বিন কাসিমকেও অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। ইরাকের নতুন গভর্নর করা হয় ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাবকে এবং সিন্ধুর শাসনক্ষমতায় মুহাম্মাদের স্থলাভিষিক্ত হন ইয়াজিদ ইবনে আবি কাবশা, যিনি হাজ্জাজের শাসনে একসময় বন্দী ও নির্যাতিত হয়েছিলেন।
নতুন গভর্নর ইয়াজিদ মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে শিকলে বেঁধে ইরাকে পাঠিয়ে দেন। অথচ মুহাম্মাদ চাইলে তার সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে স্বাধীন রাজ্য গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু খেলাফতের প্রতি আনুগত্যই তাঁর বড় পরিচয় ছিল। তিনি বিদ্রোহের বদলে অনুগত্যকেই বেছে নেন। বড় ফিতনার উত্থান হলে যেন খেলাফতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য শাসকের অন্যায় হুকুমের কাছেই নিজের জীবন কুরবানি দিয়ে দেন।
নবম শতকের খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ আহমাদ ইবনে ইয়াহিয়া আল-বালাযুরী উল্লেখ করেন,
মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে হত্যা করা হয় রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রতিহিংসার জেরে। সুলাইমান মুহাম্মাদ বিন কাসিমের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, মুহাম্মাদ তারই বিরুদ্ধে একপ্রকার বিদ্রোহ করেছেন এভাবে— হাজ্জাজের আদেশে তিনি এক সময় খেলাফতের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সুলাইমানের অবস্থানকে অস্বীকার করেছিলেন। সম্ভবত সুলাইমান তার ভাই পূর্ববর্তী খলিফা ওয়ালিদের আনুগত্যের কারণেই মুহাম্মাদের প্রতি এত আক্রোশ ছিল।
সিন্ধুর নতুন গভর্নর হিসাবে নিয়োগ পান ইয়াজিদ ইবনু আবি কাবশা, যিনি পূর্বে হাজ্জাজের হাতে অপমানিত ও বন্দী ছিলেন। তিনি ইরাকের নতুন সামরিক গভর্নর ইয়াজিদ ইবনু আল-মুহাল্লাব এবং নতুন অর্থনৈতিক গভর্নর সালিহ ইবনু আব্দুর রহমানের অধীনে কাজ করতেন। সালিহ ছিলেন একজন মুক্ত-ক্রীতদাস, যার ভাইকে হাজ্জাজের শাসনামলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
খলিফা সুলাইমানের নির্দেশে সিন্ধুর বদলি গভর্নর ইয়াজিদ ইবনু আবি কাবশা মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে গ্রেপ্তার করে শিকলে বেঁধে ইরাকে পাঠান। সেখানে সালিহ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে মুহাম্মাদ বিন কাসিম ও তাঁর আত্মীয়দের উপর নির্মম নির্যাতন চালান এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের হত্যা করেন।
পরবর্তীতে সিন্ধুর অবস্থা
---
মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিদায়ের পর নতুন নিয়োজিত গভর্নর ইয়াজিদ বিন আবি কাবশা কিছুদিন পরেই মারা যান। এরপর রাজা দাহিরের পুত্র ব্রাহ্মণাবাদ পুনরায় দখল করে। আনুমানিক ৭২০ খ্রিস্টাব্দে, তাঁকে ক্ষমা করে প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়; ইসলাম গ্রহণের শর্তে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সে ইসলাম ত্যাগ করে বিদ্রোহ করে বসে; ঠিক সেই সময়ে যখন উমাইয়া খেলাফত উত্তরসূরি সংকটে জর্জরিত ছিল। পরে, জুনায়েদ ইবনে আবদুর রহমান আল-মুররি তাকে (জয়সিয়াহকে) হত্যা করেন এবং সেই অঞ্চল পুনরায় দখল করেন। তবে তাঁর উত্তরসূরিরাও সেই অঞ্চল ধরে রাখতে হিমশিম খেতেন।
আব্বাসীয় আমলে, আনুমানিক ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় আমিররা খেলাফতের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১০ম শতকের মধ্যে অঞ্চলটি দুটি স্বতন্ত্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে— সিন্ধু নদীর নিম্নপ্রবাহে মানসুরাহ এবং উপরপ্রবাহে মুলতান। এ দুটোই ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় আরব শাসিত প্রধান রাজ্য। কিছুদিন পর অভিশপ্ত ইসমাইলি শিয়ারা এই অঞ্চলগুলো দখল করে সেখানে একটি স্বাধীন ফাতেমীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
তিন শতাব্দী ধরে দক্ষিণ পাকিস্তানের এই আরব বিজয় থমকে থাকে, কারণ উত্তরে এবং পূর্বে ছিল শক্তিশালী হিন্দু রাজারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে গজনীর সুলতান মাহমুদের আগমনের মাধ্যমে।
.
একজন তরুণ নায়ক, যিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন ইসলামের জন্য কীভাবে আত্মোৎসর্গ করতে হয়, শেষ পর্যন্ত নিজ শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অকালে ঝরে যান। তাঁর এই করুণ পরিণতি ইতিহাসে আমাদের বলে, বীরত্ব কখনো শুধু শত্রুর মোকাবেলায় নয়, কখনো কখনো নিজ গৃহের ছায়াতলেই সবচেয়ে নির্মমতার শিকার হতে হয়।