28/12/2025
১২২৩ সালের ৩১শে মে। বর্তমান ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ওব্লাস্টে কালকা নদীর তীরে ঘনিয়ে এল এক ভয়াবহ প্রলয়!
একদিকে মৃত্যুভয়হীন দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনী, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন কিংবদন্তি সেনাপতি জেব আর সুবুতাই। আর তাঁদের রুখতে দাঁড়িয়েছে রুস প্রিন্সিপালিটি (কিয়েভ ও গ্যালিসিয়া-ভোলিনিয়া) এবং কোটেনের নেতৃত্বাধীন কুমানদের এক বিশাল যৌথ জোট। এই জোটের সেনাপতি ছিলেন দুই মহারথী—মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড এবং কিয়েভের তৃতীয় মস্তিস্লাভ।
কালকা নদীর তীরে বেজে উঠল সেই রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের রণদামামা। তরবারির ঝনঝনানি আর রক্তের স্রোতে ভেসে গেল প্রান্তর। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। যুদ্ধের শেষে মোঙ্গলদের চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী জয়ে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। কালকার রক্তস্নাত ঐতিহাসিক মহাযুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে পড়ুন কালকার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মোঙ্গল, প্রথম পর্ব
স্তেপের শার্দূল চেঙ্গিজ খান, চতুর্থ পর্ব
=======================
কাল্কার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মঙ্গোল, প্রথম পর্ব
=============================
ভূমিকা: ঝড়ের পূর্বাভাস
—-----------------------
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিক। এশিয়ার বুক চিরে তখন জেগে উঠছে এক অদম্য শক্তি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। গোবি মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তর থেকে উঠে আসা এক যাযাবর জাতি, যাদের পায়ের তলার মাটি আর ঘোড়ার খুরের ধুলো একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে দিগন্তে। তারা মঙ্গোল। তাদের নেতা, চেঙ্গিস খান, তখন কেবল একজন মানুষ নন, বরং সাক্ষাৎ যমদূতের মতো পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছেন। কিন্তু এই কাহিনী চেঙ্গিস খানের নয়, এই কাহিনী তাঁর দুই বিশ্বস্ত ও ধূর্ত সেনাপতি—জেবে এবং সুবুতাই-এর, এবং তাদের সেই অবিশ্বাস্য অভিযানের, যা রাশিয়ার বুকে এক দগদগে ক্ষতের মতো চিরস্থায়ী হয়ে আছে।
সালটা ১২২৩ খ্রিস্টাব্দ। রাশিয়ার দক্ষিণ প্রান্তের বিস্তীর্ণ স্তেপ অঞ্চল বা তৃণভূমি তখনো জানে না, তাদের দিকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। এই ঝড় প্রকৃতির নয়, মানুষের তৈরি। এই ঝড়ের নাম 'কাল্কার যুদ্ধ'। এটি কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সভ্যতা, ভিন্ন রণকৌশল এবং ভিন্ন জীবনদর্শনের এক ভয়াবহ সংঘর্ষ। একদিকে রাশিয়ার গর্বিত রাজকুমারগণ, তাদের ভারী বর্ম, আভিজাত্যের অহংকার এবং ইউরোপীয় যুদ্ধের সনাতন রীতি; অন্যদিকে মঙ্গোলদের ক্ষিপ্রগতি, ছলনা, এবং মৃত্যুর মতো নীরব ও নির্ভুল তীরন্দাজি।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কেবল যুদ্ধের তারিখ বা হার-জিতের পরিসংখ্যান তুলে ধরা নয়। আমরা ফিরে যাব সেই সময়ে, অনুভব করব সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো, যখন কাল্কা নদীর জল মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। আমরা বিশ্লেষণ করব সেই রণকৌশল, যা সংখ্যায় কম হয়েও মঙ্গোলদের এনে দিয়েছিল অবিশ্বাস্য বিজয়। এটি একটি ঐতিহাসিক দলিলায়ন, যা উপন্যাসের রোমাঞ্চ নিয়ে পাঠককে নিয়ে যাবে মধ্যযুগের সেই ভয়াল রণক্ষেত্রে।
প্রথম অধ্যায়: মঙ্গোল রণযন্ত্র – এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ
—---------------------------------------------------
কাল্কার যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে মঙ্গোলদের যুদ্ধের কৌশল। ইউরোপ, রাশিয়া আর ভারতের পৃথ্বীরাজ চৌহান সহ অনান্য রাজপুত রাজাদের কাছে যুদ্ধ ছিল সম্মুখ সমরের বীরত্ব। কিন্তু মঙ্গোলদের কাছে যুদ্ধ ছিল এক ধরণের শিকার। তারা শত্রুকে মানুষ বলে গণ্য করত না, গণ্য করত শিকারের পশু হিসেবে।
অশ্বারোহী বাহিনী: ঝড়ের গতি
—-----------------------------
মঙ্গোল বাহিনীর মেরুদণ্ড ছিল তাদের ঘোড়া। মঙ্গোল ঘোড়াগুলো আকারে ছোট হলেও ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সহনশীল। একজন মঙ্গোল যোদ্ধা কেবল ঘোড়ায় চড়ত না, সে ঘোড়ার পিঠেই বড় হতো। তাদের বলা হতো "সেন্টর" বা অশ্বমানব। যুদ্ধের সময় প্রতিটি মঙ্গোল যোদ্ধার সাথে থাকত একাধিক ঘোড়া (প্রায় তিন থেকে চারটি)। একটি ঘোড়া ক্লান্ত হলে তারা চলন্ত অবস্থাতেই লাফিয়ে অন্য ঘোড়ায় উঠে পড়ত। এর ফলে তারা দিনে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারত, যা তৎকালীন অন্য কোনো সেনাবাহিনীর পক্ষে ছিল অকল্পনীয়। এই অতিমানবীয় গতিই ছিল তাদের বিজয়ের অন্যতম চাবিকাঠি। শত্রুপক্ষ খবর পাওয়ার আগেই মঙ্গোলরা তাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলত।
ধনুর্বিদ্যা: দূর থেকে মৃত্যু
—-----------------------
মঙ্গোলদের প্রধান অস্ত্র ছিল তাদের 'কম্পোজিট বো' বা যৌগিক ধনুক। কাঠ, শিং এবং প্রাণীর পেশীতন্তু দিয়ে তৈরি এই ধনুকগুলো ছিল ছোট কিন্তু মারাত্মক শক্তিশালী। ঘোড়ার পিঠে পূর্ণ গতিতে ছুটে চলার সময়ও মঙ্গোলরা শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে নির্ভুল নিশানায় তীর ছুড়তে পারত। তাদের তীরের পাল্লা ছিল রাশিয়ান বা ইউরোপীয় ধনুকের চেয়ে অনেক বেশি। তারা এমন এক ধরণের তীর ব্যবহার করত যা ভারী বর্ম ভেদ করতে সক্ষম ছিল।
তাদের রণকৌশলের একটি বিশেষ দিক ছিল 'পার্থিয়ান শট' বা পশ্চাদপসরণের ভান করে পিছন ফিরে তীর ছোড়া। শত্রু যখন ভাবত মঙ্গোলরা ভয় পেয়ে পালাচ্ছে, তখন তারা উল্লাসে ধাওয়া করত, আর তখনই মঙ্গোলরা ঘোড়ার পিঠে উল্টো ঘুরে বৃষ্টির মতো তীর ছুড়ে শত্রুকে ধরাশায়ী করত।
শৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা
—------------------------
রাশিয়ার রাজাদের সেনাবাহিনী ছিল সামন্ততান্ত্রিক। সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বীরত্ব প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা ছিল বেশি। কিন্তু মঙ্গোল বাহিনী ছিল একটি নিখুঁত যন্ত্রের মতো। সেখানে একক বীরত্বের চেয়ে দলগত শৃঙ্খলা ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা দশমিক পদ্ধতিতে সংগঠিত ছিল—দশ, শত, সহস্র এবং অযুত (তুমান)। যুদ্ধের ময়দানে কোনো প্রকার শব্দ না করে কেবল নিশান বা পতাকার সংকেতে হাজার হাজার সৈন্য মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করতে পারত।
তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। আক্রমণের আগে তারা বণিক বা পর্যটকদের ছদ্মবেশে গুপ্তচর পাঠাত। শত্রুর দুর্বলতা, রসদ ভাণ্ডার, এবং রাজনৈতিক বিরোধ—সবকিছুই তাদের নখদর্পণে থাকত। কাল্কার যুদ্ধের আগেও সুবুতাই জানতেন যে রাশিয়ার রাজকুমারদের মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে, এবং তিনি সেই ফাটলটিকেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়: কিয়েভান রাশ – অহংকার ও বিভেদ
—---------------------------------------------------
ককেশাসের ওপারে কৃষ্ণমেঘ
—----------------------------
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্ন। এশিয়ার বক্ষপিঞ্জর ভেদ করে এক ভয়াবহ ঝড়ের উৎপত্তি হয়েছিল, যার নাম চেঙ্গিস খান। কিন্তু এই কাহিনী চেঙ্গিস খানের নয়, এই কাহিনী তাঁরই দুই কালান্তক অনুচর—জেব এবং সুবুতাইয়ের। খোয়ারজিম সাম্রাজ্যের পতন তখন সম্পূর্ণ। সমরকন্দ ও বুখারার সমৃদ্ধি এখন ধূলিসাৎ, নরপতির দম্ভ চূর্ণ হয়েছে মঙ্গোল অশ্বখুরের আঘাতে। কাস্পিয়ান সাগরের তীরে এক নির্জন দ্বীপে খোয়ারজিম অধিপতি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তখন দিগন্তে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা যেন এক নতুন প্রলয়ের ইঙ্গিত বহন করে আনল।
চেঙ্গিস খান তখনো তাঁর ক্রোধ সংবরণ করেননি। তিনি তাঁর দুই বিশ্বস্ত সেনাপতিকে আহ্বান করলেন। জেব, যাকে বলা হয় 'তীর', এবং সুবুতাই, যিনি 'লৌহকুকুর' নামে খ্যাত—তাঁরা এসে আনত মস্তকে আদেশের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। চেঙ্গিস খান বললেন, "পশ্চিমের দ্বার উন্মুক্ত। যাও, দেখে এসো সেই অজ্ঞাত ভূখণ্ডে আর কোন শক্তি লুকিয়ে আছে। তবে মনে রেখো, তিন বছরের মধ্যে ফিরে আসা চাই।"
মাত্র কুড়ি হাজার অশ্বারোহী নিয়ে দুই সেনাপতি যাত্রা শুরু করলেন। এই কুড়ি হাজার যোদ্ধা কেবল সংখ্যায় নয়, শৌর্য ও রণকৌশলে ছিল তৎকালীন বিশ্বের ত্রাস। তাদের অশ্বগুলি ছিল খর্বকায় কিন্তু বিদুৎগতিসম্পন্ন, আর তাদের ধনু ছিল যমদূতের মতো অব্যর্থ। খোয়ারজিম ধ্বংসের পর এই বাহিনী যখন ককেশাসের পানে ধাবিত হলো, তখন ধরিত্রী যেন প্রমাদ গুনল।
শীতকাল। ১২২১ খ্রিষ্টাব্দ। জর্জিয়ার পার্বত্য উপত্যকায় তখন তুষারপাত শুরু হয়েছে। জর্জিয়ার রাজা চতুর্থ জর্জ তখন যৌবনের মদে মত্ত। তাঁর গর্ব ছিল তাঁর লৌহবর্মাবৃত ভারী অশ্বারোহী বাহিনী বা 'নাইট'-দের নিয়ে। তিনি ভাবলেন, এই জাজাবর দস্যুরা তাঁর সুশিক্ষিত বাহিনীর সামনে ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে। কিন্তু তিনি জানতেন না, যাদের সঙ্গে তিনি যুদ্ধে লিপ্ত হতে চলেছেন, তারা সাধারণ দস্যু নয়—তারা যুদ্ধের এক নতুন ব্যাকরণ রচয়িতা।
সুবুতাই জানতেন, জর্জিয়ার ভারী অশ্বারোহীদের সম্মুখ সমরে পরাস্ত করা কঠিন। তাই তিনি আশ্রয় নিলেন তাঁর চিরপরিচিত 'কূটকৌশল'-এর। মঙ্গোল বাহিনী জর্জিয়ানদের দেখামাত্র তীর বর্ষণ করে সহসা পশ্চাদপসরণ শুরু করল। জর্জিয়ান নাইটরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। তারা ভাবল, ভীরু যাযাবররা পালাচ্ছে। অশ্বের রাশ আলগা করে তারা মঙ্গোলদের পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু এটাই ছিল সুবুতাইয়ের পাতা ফাঁদ। যখন জর্জিয়ান বাহিনী ক্লান্ত এবং বিচ্ছিন্ন, ঠিক তখনই মঙ্গোল অশ্বারোহীরা অশ্বের মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল। পলায়নপর হরিণ মুহূর্তেই নেকড়ের রূপ ধারণ করল। মঙ্গোলদের তূণীরের অগণিত শর জর্জিয়ান নাইটদের বিদ্ধ করতে লাগল। তুষারশুভ্র প্রান্তর রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। জর্জিয়ার গর্ব সেই দিন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল।
তৃতীয় অধ্যায়: পর্বতের ছলনা ও বন্ধুত্বের বিষ
—--------------------------------------------
জর্জিয়া জয়েই মঙ্গোলদের তৃষ্ণা মিটল না। তারা ককেশাস পর্বতমালা অতিক্রম করে আরও উত্তরে অগ্রসর হওয়ার সংকল্প করল। কিন্তু এই পথ ছিল কন্টকাকীর্ণ। পর্বতের ওপারে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক বিশাল জোট। লেজগিন, সার্কাশিয়ান, এবং কিপচাক (যাদের রুশের অধিবাসীরা 'কুমান' বা 'পোলভত্সিয়ান' বলত)—এই পার্বত্য ও যাযাবর জাতিগোষ্ঠীগুলি একত্রিত হয়ে মঙ্গোলদের পথরোধ করল। সংখ্যায় তারা ছিল মঙ্গোলদের দ্বিগুণ। যাযাবর হবার কারনে এদের রণনীতিও ছিল অনেকটা মঙ্গোলদের মতোই।
সুবুতাই দেখলেন, বলপ্রয়োগে এই ব্যূহ ভেদ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি ব্যবহার করলেন সেই অস্ত্র, যা তলোয়ারের চেয়েও ধারালো—বুদ্ধি। তিনি লক্ষ্য করলেন, এই জোটের মধ্যে কিপচাকরা জাতিতে তুর্কি এবং যাযাবর, মঙ্গোলদের সঙ্গে তাদের রক্তের সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি গোপনে কিপচাক দলপতির কাছে দূত পাঠালেন।
দূত গিয়ে বলল, "হে ভ্রাতৃবৃন্দ, আমরা তো একই আকাশের নিচে পালিত যাযাবর। আমাদের রক্ত এক, জীবন এক। তোমরা কেন ওই পার্বত্য কৃষিজীবী ও নগরবাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছ? ওরা আমাদের শত্রু। তোমরা যদি আমাদের পথ ছেড়ে দাও, তবে জর্জিয়া থেকে লুণ্ঠিত সমস্ত ধনরত্ন আমরা তোমাদের উপহার দেব।"
কিপচাকরা প্রলোভনে পড়ল। স্বর্ণ ও রত্নের দ্যুতি তাদের অন্ধ করে দিল। তারা ভাবল, মঙ্গোলরা তো চলেই যাচ্ছে, অকারণে রক্তক্ষয় করে কী লাভ? তারা জোট ত্যাগ করে নিজের বাড়ি ফিরে গেল। জোট ভেঙে পড়ল। নিঃসঙ্গ লেজগিন ও সার্কাশিয়ানরা মঙ্গোলদের আক্রমণের মুখে খড়কুটার মতো ভেসে গেল। সুবুতাইয়ের বাহিনী নির্মমভাবে তাদের হত্যা করল।
কিন্তু নাটকের শেষ অঙ্ক তখনো বাকি ছিল। কিপচাকরা যখন লুণ্ঠিত ধনের স্বপ্ন দেখছে, তখন মঙ্গোলরা বিদ্যুৎগতিতে তাদের পিছু ধাওয়া করল। সুবুতাইয়ের নীতি ছিল সরল—বিশ্বাসঘাতককে বিশ্বাস করতে নেই, আর শত্রুকে জীবিত রাখতে নেই। অরক্ষিত কিপচাকদের ওপর মঙ্গোল বাহিনী ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ল। যারা বন্ধু ভেবে পথ ছেড়ে দিয়েছিল, তারাই এখন মঙ্গোল অসির আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড হতে লাগল। কিপচাক দলপতি কোতিয়ান খান কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালালেন। তাঁর পেছনে পড়ে রইল তাঁর স্বজাতির ছিন্নভিন্ন দেহ ও জ্বলন্ত গ্রাম।
চতুর্থ অধ্যায়: রুশের দ্বারে অশনি সংকেত
—-----------------------------------------
প্রাণভয়ে ভীত কোতিয়ান খান পালিয়ে এলেন তাঁর জামাতা, গ্যালিসিয়ার যুবরাজ 'মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড' বা 'সাহসী মস্তিস্লাভ'-এর দরবারে। ছিন্নবস্ত্র, ধূলিমলিন শরীরে তিনি যখন রুশ রাজসভায় প্রবেশ করলেন, তখন এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা নেমে এল। কোতিয়ান খান আর্তনাদ করে বললেন, "আজ ওরা আমাদের ভূমি গ্রাস করেছে, কাল ওরা তোমাদের ভূমি কেড়ে নেবে। এই যাযাবররা মানুষ নয়, ওরা নরকের কীট। এখনই যদি আমরা একত্রিত না হই, তবে রুশের পবিত্র মাটি শীঘ্রই মঙ্গোল অশ্বখুরে দলিত হবে।"
সেই সময় রাশিয়া জার সম্রাটদের দ্বারা শাসিত কোনো অখণ্ড সাম্রাজ্য ছিল না। 'কিয়েভান রুস' ছিল বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের সমষ্টি। প্রতিটি রাজ্যের অধিপতি ছিলেন এক একজন রাজপুত্র বা 'প্রিন্স'। এই রাজপুত্রদের মধ্যে ঐক্যের অভাব ছিল প্রবল, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাঁরা সর্বদা লিপ্ত থাকতেন। কিন্তু কোতিয়ান খানের মুখে মঙ্গোল দূতদের বিশ্বাসঘাতকতা আর মঙ্গোল সেনাদের পৈশাচিক বর্বরতার কাহিনী শুনে তাঁরা শিহরিত হলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই বিপদ একার নয়, সকলের।
কিয়েভ নগরে এক মহাসম্মেলন ডাকা হলো। সেখানে উপস্থিত হলেন রুশের তিন প্রধান স্তম্ভ—কিয়েভের মস্তিস্লাভ, চেরনিগভের মস্তিস্লাভ এবং গ্যালিসিয়ার মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড। ইতিহাসের পাতায় তাঁরা 'তিন মস্তিস্লাভ' নামে পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন ভলিন, স্মোলেনস্ক এবং অন্যান্য অঞ্চলের অধিপতিরা। তাঁদের সম্মিলিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় আশি হাজার—তৎকালীন সময়ের হিসেবে এক বিশাল সমুদ্রসম বাহিনী। মঙ্গোলদের কুড়ি হাজার অশ্বারোহীর বিরুদ্ধে এই সংখ্যা ছিল অকল্পনীয়।
এরপর মঙ্গোলরা দ্বিতীয়বার দূত পাঠাল, যারা এসে ঘোষণা করল, "আপনারা যখন যুদ্ধের পথই বেছে নিয়েছেন এবং আমাদের দূত হত্যা করেছেন, তবে তাই হোক। ঈশ্বর সাক্ষী, আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে চাইনি। কিন্তু এখন, যুদ্ধই আপনাদের ভাগ্য।"
পঞ্চম অধ্যায়: যাত্রা এবং প্রথম বিভ্রান্তি
—--------------------------------------
১২২৩ সালের এপ্রিল মাস। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সৈন্যরা সমবেত হতে শুরু করল। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সম্মিলিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০,০০০ (যদিও সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে)। এটি ছিল এক বিশাল বাহিনী। কিয়েভ, গালিচিয়া, চেরনিগভ, ভলিনিয়া—সমস্ত রাজ্যের পতাকা উড়ছে বাতাসে। তাদের সাথে যোগ দিল কুমেনদের অশ্বারোহী বাহিনী।
রুশ ও কুমানদের সম্মিলিত বাহিনী যখন দিনিপার (Dnieper) নদীর তীরে সমবেত হলো, তখন মঙ্গোলরা পুনরায় তাদের কুটনীতির খেলা খেলল। মঙ্গোল দূতরা রুশ শিবিরে এসে বিনীতভাবে বলল:
"হে মহান রুশ অধিপতিগণ, আমাদের বিবাদ তো আপনাদের সঙ্গে নয়, আমাদের শত্রু ওই কুমানরা। ওরা আপনাদেরও বহু ক্ষতি করেছে, আপনাদের গ্রাম লুণ্ঠন করেছে। আপনারা কেন অনর্থক ওদের পক্ষ নিচ্ছেন? আমরা আপনাদের সঙ্গে মৈত্রী চাই।"
রুশ রাজপুত্রদের আত্মবিশ্বাস ছিল গগনচুম্বী। তাঁরা ভাবলেন, “কিপচাকদের বিরুদ্ধে মঙ্গোল দূতেরা যেমন ছলনা করেছিল, এরাও তেমনই গুপ্তচর। তাছাড়া এই বন্য তাতাররা তাঁদের সুশিক্ষিত ও বর্মাবৃত 'দ্রুজিনা' (রাজকীয় দেহরক্ষী) বাহিনীর সামনে কতক্ষণই বা আর টিকবে?” তাই তাঁরা যুদ্ধের প্রাক্কালে এক গর্হিত অপরাধ করে বসলেন। ক্রুদ্ধ রুশ রাজপুত্ররা সেই মঙ্গোল দূতদের তৎক্ষণাৎ হত্যা করলেন।
মঙ্গোলদের কাছে দূতের হত্যা ছিল ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ। চেঙ্গিস খানের আইনে এর একমাত্র শাস্তি—মৃত্যু এবং ধ্বংস। রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাত খুঁজতে থাকা যুদ্ধবাজ সুবুতাই যখন এই সংবাদ পেলেন, তখন তাঁর চোখ থেকে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হলো। তিনি শপথ করলেন, এই ধৃষ্টতার প্রতিশোধ তিনি নেবেনই। এটি আর কেবল রাজ্য জয়ের যুদ্ধ রইল না, এটি পরিণত হলো এক পবিত্র রক্তশপথের সংগ্রামে।
গ্যালিসিয়ার মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড তাঁর বাহিনী নিয়ে দিনিপার নদী পার হলেন এবং মঙ্গোলদের সম্মুখভাগের একটি ক্ষুদ্র দলকে আক্রমণ করলেন। মঙ্গোলরা সামান্য প্রতিরোধ করে পলায়ন করল। রুশরা উল্লসিত হলো। তারা ভাবল, এই তাতাররা তো ভীরু! তাদের সেনাপতিকে ধৃত ও হত্যা করা হলো।
এই প্রাথমিক বিজয়ই ছিল রুশদের জন্য কালস্বরূপ। তারা জানত না, মঙ্গোলরা ইচ্ছা করেই হারছে। সুবুতাই ও জেবে তাদের মূল বাহিনী নিয়ে ধীরে ধীরে পেছাতে শুরু করলেন। রুশ বাহিনী বিজয়ের মদে মত্ত হয়ে তাদের পিছু নিল।
একদিন নয়, দুইদিন নয়—টানা নয় দিন ধরে চলল এই ধাবন। মঙ্গোলরা কেবল পেছাতেই থাকল, যেন তারা ভীত সন্ত্রস্ত হরিণের দল। কিন্তু আসলে তারা রুশ বাহিনীকে গভীর স্তেপের নির্জন প্রান্তরে টেনে আনছিল, যেখানে রুশদের রসদ মিলবে না। এই দীর্ঘ যাত্রায় রুশ বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সবচাইতে বড় বিপর্যয় ঘটল তাদের বিন্যাসে। দ্রুতগামী কুমান ও গ্যালিসিয়ান অশ্বারোহীরা অনেক দূর এগিয়ে গেল, আর কিয়েভ ও চেরনিগভের ভারী পদাতিক ও রসদবাহী গাড়িগুলি অনেক পশ্চাতে পড়ে রইল। রুশ বাহিনীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, ঠিক যেমনটি সুবুতাই চেয়েছিলেন।
(এরপর পরবর্তী পর্বে)
তৃতীয় পর্বের লিঙ্ক: https://www.facebook.com/share/p/16SDEgp74A/