বিশ্বের সামরিক ইতিহাস আর অজানা রহস্য

  • Home
  • India
  • KOLKATA
  • বিশ্বের সামরিক ইতিহাস আর অজানা রহস্য

বিশ্বের সামরিক ইতিহাস আর অজানা রহস্য Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from বিশ্বের সামরিক ইতিহাস আর অজানা রহস্য, History Museum, KOLKATA.

আজ পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। অর্থাৎ বাংলা ক্যালেন্ডারের আজই প্রথম বছর বৈশাখের প্রথম দিন। বঙ্গদেশের ইতিহাস মতে ৫৯৩/৫৯৪ খ্...
15/04/2026

আজ পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। অর্থাৎ বাংলা ক্যালেন্ডারের আজই প্রথম বছর বৈশাখের প্রথম দিন। বঙ্গদেশের ইতিহাস মতে ৫৯৩/৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শশাঙ্ক গৌড়ের রাজসিংহাসনে আসীন হয়ে বাংলা সম্বৎ চালু করেন। নিজের রাজ্যাভিষেকের দিনটি স্মরণীয় করে রাখবার ইচ্ছায় সম্রাট শশাঙ্ক সেইদিন থেকেই শুরু করেন আসল প্রাচীন বাংলা সম্বৎ।

এরপর বিদেশি তুর্কি আগ্রাসনকারীরা দখল করে বাংলা। বাংলা সম্বতেও অবধারিতভাবে লাগে সৌদি আরবের মরুভূমির শুষ্ক হওয়া। ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিজাত সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ আরবের হজরত মহম্মদের জন্মের সাথে সাযুজ্য রেখে ইসলামিক চান্দ্র হিজরী ক্যালেন্ডারের সাথে সৌর বাংলা সম্বৎ ক্যালেন্ডারের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন বঙ্গাব্দ শুরু করেন।

এরপর আফগান তুর্কিদের হাত থেকে বাংলার দখল আসে উজবেকজাত চুগাতাই তুর্কি মোগলদের হাতে। মোগলদের শাসনকালে চান্দ্র ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে সেই ক্যালেন্ডারের নববর্ষের মাসে বাংলা থেকে কর আদায় করা হতো। কিন্তু চন্দ্রজাত ইসলামিক ক্যালেন্ডারের সাথে সৌরজাত মূল বাংলা ক্যালেন্ডারের কৃষিকার্যের সময়কাল না মেলার ফলে ইসলামিক নববর্ষের মাসে বাংলায় কৃষিকার্য থেকে উৎপন্ন কর আদায় নিতান্তই কম হতো। এরপর চতুর আকবরের নির্দেশে বাদশাহের রাজসভার প্রধান জ্যোতিষী ফতেউল্লাহ সিরাজি পূর্বের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পথ অনুসরণ করে চান্দ্র ইসলামিক আর সৌর বাংলা হিন্দু সম্বৎ ক্যালেন্ডার মিশ্রণ করে আরেকটা নতুন বঙ্গাব্দের সূচনা করেন।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের একাধিক রাজ্যে সম্রাট শশাঙ্কের প্রাচীন বাংলা সম্বতকেই আসল বাংলা ক্যালেন্ডারের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। হিন্দু ক্যালেন্ডার বিক্রমী সম্বতের ন্যায় শশাঙ্কের দ্বারা স্থাপিত বাংলা সম্বতও বিভক্ত হয়েছে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন আর চৈত্র মাসে। বাংলা সম্বৎ আর বিক্রমী সম্বৎ দুটো ক্যালেন্ডারই প্রাচীন বেদাঙ্গের জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারেই নির্মিত হয়েছে। দুটো ক্যালেন্ডারেই ১২টি মাস আর সপ্তাহে ৭টি দিন। দুটো ক্যালেন্ডারেই সাতটি দিনের নামকরণ করা হয়েছে আর্যভট্টের দ্বারা নামাঙ্কিত নবগ্রহের নাম অনুসারে। কিন্তু এতো মিল সত্ত্বেও তবুও রয়ে গিয়েছে কিছু পার্থক্য বাংলা সম্বৎ আর বিক্রমী সম্বতের মধ্যে। প্রথম পার্থক্য বিক্রমী সম্বৎ অনেকটা ইসলামিক ক্যালেন্ডারের ন্যায় চান্দ্র নির্ভর। বিক্রমী সম্বতে মাসের হিসাব রাখা হয় চাঁদের উপর নির্ভর করে। শুধু লিপ ইয়ারের মতো বছরের ভগ্নাংশ গণনার জন্য সৌর অর্থাৎ সূর্যের ঘূর্ণনের সাহায্য নেওয়া হয়। কিন্তু শশাঙ্কের বাংলা সম্বৎ পুরোপুরি সৌর নির্ভর। বাংলা সম্বতের ক্ষেত্রে মূলত পঞ্চম শতাব্দীর জ্যোতিষ আর্যভট্টের সৌর নির্ভর গণনা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আর্যভট্ট ছাড়াও ষষ্ঠ শতাব্দীর লতাদেব, বরাহমিহির, সপ্তম শতাব্দীর ব্রহ্মগুপ্ত আর অষ্টম শতাব্দীর লল্লার দ্বারা পরিচালিত সৌরবর্ষ গণনা পদ্ধতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বাংলা সম্বৎ। তৃতীয়ত বিক্রমী সম্বতের নববর্ষ শুরু হয় চৈত্র মাস (খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের মার্চ-এপ্রিল) থেকে, বাংলা সম্বতের মতো বৈশাখ মাস থেকে নয়। গ্রুপের সকলকে পয়লা বৈশাখের প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

ব্যাটেলফিল্ড কাশ্মীর ১৯৪৭: স্বাধীন ভারতের প্রথম যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস আখ্যান, প্রথম পর্ব===================================...
31/03/2026

ব্যাটেলফিল্ড কাশ্মীর ১৯৪৭: স্বাধীন ভারতের প্রথম যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস আখ্যান, প্রথম পর্ব
===========================================
প্রস্তাবনা: একটি গোপন খাম এবং আসন্ন ঝড়ের পদধ্বনি
—--------------------------------------------------------
দিনটি ছিল ২০শে আগস্ট, ১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ শাসন থেকে সদ্য স্বাধীনতা লাভ করে ভারত ও পাকিস্তান তখন নিজেদের সীমানা এবং অস্তিত্ব গোছাতে ব্যস্ত। নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে (বর্তমান পাকিস্তান) ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ব্রিগেড মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন মেজর ওঙ্কার সিং কালকাট। তাঁর কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার মারে তখন বাইরে। এমন সময় মেজর কালকাটের হাতে এসে পৌঁছায় 'টপ সিক্রেট' স্ট্যাম্প মারা একটি খাম।

খামটি খুলতেই তাঁর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। ভেতরে রয়েছে 'অপারেশন গুলমার্গ'-এর এক বিস্তারিত ও ভয়াবহ নীলনকশা। স্তব্ধ হয়ে গেলেন মেজর কালকাট। তিনি বুঝতে পারলেন, নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসক ও সামরিক কর্তারা কাশ্মীর দখলের এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তড়িঘড়ি তিনি ব্রিগেডিয়ার মারেকে বিষয়টি জানালে, মারে তাঁকে সতর্ক করে দেন যেন এই কথা কাকপক্ষীও টের না পায়, অন্যথায় পাকিস্তান থেকে তাঁকে জীবিত ফিরতে দেওয়া হবে না। তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। কিন্তু অদম্য সাহসী কালকাট সেই বন্দিদশা থেকে এক দুঃসাহসিক পলায়ন করে প্রায় দুই মাস পর, অক্টোবরে নয়াদিল্লিতে পৌঁছান। ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে তিনি জানিয়ে দেন আসন্ন এক ভয়াবহ ঝড়ের কথা—যাঁর নাম 'অপারেশন গুলমার্গ'।

প্রথম অধ্যায়: ডোগরা রাজবংশের শৌর্য এবং মহারাজা হরি সিংয়ের দোদুল্যমানতা
===========================================
কাশ্মীরের ডোগরা রাজবংশের উত্থানের ইতিহাস ছিল বীরত্ব ও শৌর্যে ঘেরা। ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের পর অমৃতসরের চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ৭৫ লক্ষ নানকশাহী টাকার বিনিময়ে কাশ্মীর কিনে নেন মহারাজা গুলাব সিং। প্রতিষ্ঠা হয় ডোগরা রাজবংশের। গুলাব সিংয়ের সেনাপতি জেনারেল জোরাওয়ার সিং—যাঁকে ইতিহাসবিদরা 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলে আখ্যা দিয়েছেন—এক দুর্ধর্ষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে লাদাখ, বাল্টিস্তান জয় করে তিব্বত পর্যন্ত ডোগরাদের বিজয়পতাকা উড়িয়েছিলেন। গুলাব সিংয়ের পর রণবীর সিং এবং প্রতাপ সিংয়ের মতো রাজারাও এক শক্তিশালী সামরিক ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন। তাঁদের আমলে কাশ্মীরের 'স্টেট ফোর্স' ছিল এক সুশৃঙ্খল এবং পরাক্রমশালী বাহিনী, যারা দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে লড়াই করতে সিদ্ধহস্ত ছিল।

তবে ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস লুকিয়ে ছিল কাশ্মীরের জনমিতিতে এবং অতীতের এক গভীর ক্ষতবিক্ষত অধ্যায়ে। চতুর্দশ শতাব্দীতে শাহ মীর বংশ কাশ্মীরে প্রথম ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর, বলপূর্বক সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রজাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছিল। কিন্তু ১৮৪৬ সালে হিন্দু রাজপুত ডোগরা রাজবংশ যখন কাশ্মীরের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তারা তাদের মুসলিম প্রজাদের বলপূর্বক পুনরায় হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কোনো চেষ্টাই করেনি। ইতিহাসের অনেক নির্মম বিশ্লেষকের মতে, ডোগরাদের এই ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান বা রাজনৈতিক 'মূর্খতা'-ই ১৯৪৭ সালে কাল হয়ে দাঁড়ায় মহারাজা হরি সিংয়ের জন্য। তাঁর শাসনকালে জম্মু ও কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিলেন মুসলিম।

১৯৪৭ সালে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বারুদ স্থুপাকৃত। বর্তমান মহারাজা হরি সিং তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো দূরদর্শী বা পরাক্রমশালী সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন কাশ্মীরের মতো এক বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ভূখণ্ড রক্ষার জন্য তাঁর সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল এবং যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের সময় নবগঠিত পাকিস্তান এই ধর্মীয় জনমিতিকেই তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। পাকিস্তানের ক্রমাগত উসকানিতে এবং ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রজারা দুর্বল হিন্দু মহারাজা হরি সিংয়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। সর্দার মুহাম্মদ ইব্রাহিম খান এবং শেখ আবদুল্লার মতো নেতাদের নেতৃত্বে শুরু হয় এক প্রবল গণবিদ্রোহ, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে পুঞ্চ অঞ্চল। এটি ছিল মহারাজার গদির ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক ভূমিকম্প।

রাজনৈতিক দিক থেকেও মহারাজা ছিলেন চরম দোদুল্যমান। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীরের শাসক ছিলেন হিন্দু মহারাজা হরি সিং। তিনি ভারত বা পাকিস্তান, কোনো দেশেই যোগ না দিয়ে সুইজারল্যান্ডের মতো কাশ্মীরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাখতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের সাথে তিনি একটি 'স্ট্যান্ডস্টিল এগ্রিমেন্ট' (Standstill Agreement) বা স্থিতাবস্থা চুক্তি করেছিলেন, কিন্তু ভারতের সাথে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কালক্ষেপণ করছিলেন। মহারাজা হরি সিংয়ের এই সিদ্ধান্তহীনতা, সামরিক দুর্বলতা এবং তাঁর রাজ্যের অভ্যন্তরে মাথাচাড়া দেওয়া ধর্মীয় বিদ্রোহের সুযোগ নিয়েই পাকিস্তান পিছন থেকে ছুরি মারার ছক কষতে শুরু করে।

দ্বিতীয় অধ্যায়: অপারেশন গুলমার্গ - বিশ্বাসঘাতকতার নীলনকশা
=======================================
'অপারেশন গুলমার্গ' নামের এই অভিযানের দুটি পর্যায় ছিল। প্রথম পর্যায়—'ডাইভারশন' বা মনোযোগ ঘোরানো। কাশ্মীরের ছোট ছোট শহরে প্রক্সি যোদ্ধাদের দিয়ে হামলা চালিয়ে কাশ্মীরি স্টেট ফোর্সকে বিভক্ত এবং দুর্বল করে দেওয়া। দ্বিতীয় পর্যায়—'ইনভেশন' বা চূড়ান্ত আক্রমণ। নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স থেকে প্রায় ২০,০০০ অনিয়মিত উপজাতীয় মিলিশিয়া বা ট্রাইবালদের জড়ো করে শ্রীনগর দখল করা। প্রতিটি ট্রাইবাল ইউনিটে ১০০০ জন যোদ্ধা ছিল, যাদের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সেনার মেজর ও জুনিয়র কমিশন্ড অফিসাররা। এই পুরো বাহিনীর কোডনেম ছিল 'তারিক', আর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পাকিস্তানি সেনার মেজর জেনারেল আকবর খান। তাদের লক্ষ্য ছিল মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর দখল করে মহারাজা হরি সিংকে সিংহাসনচ্যুত করা। আক্রমণের দিন বা ডি-ডে ঠিক হয় ২২শে অক্টোবর, ১৯৪৭।

তৃতীয় অধ্যায়: উরির পতন এবং এক অসম সাহসী বীরের আত্মবলিদান
===========================================
২২শে অক্টোবর ভোরবেলা। প্রায় ১০,০০০ উপজাতীয় হানাদার মুজাফফরাবাদ এবং দোমেলে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। মহারাজা হরি সিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল তাঁর নিজের বাহিনীর ভেতর থেকে আসা বিশ্বাসঘাতকতা। মুজাফফরাবাদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা ৪র্থ জম্মু ও কাশ্মীর ইনফ্যান্ট্রির মুসলিম সেনারা বিদ্রোহ করে বসে। তারা তাদেরই কমান্ডিং অফিসার কর্নেল নারায়ণ সিংকে হত্যা করে এবং হানাদারদের কাশ্মীরের ভেতরে প্রবেশের রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে শহরগুলোর পতন ঘটে।

খবর পৌঁছায় শ্রীনগরে মহারাজার প্রাসাদে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে মহারাজা হরি সিং তাঁর চিফ অফ স্টাফ, কাশ্মীরের স্টেট ফোর্সের প্রধান ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিংকে জরুরি তলব করেন। মহারাজা তাঁকে কড়া নির্দেশ দেন— "যে কোনো মূল্যে এই হানাদারদের ঠেকাতে হবে। অন্তিম জীবিত সৈন্য এবং অন্তিম গুলি অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।"

গ্রীক লোকগাঁথার রাজা লিওনিদাস আর তাঁর ৩০০ জন স্পার্টান সেনাদের মতো অকুতভয় বীর যোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিংও জানতেন এটি একপ্রকার আত্মঘাতী মিশন। তবুও তিনি তাঁর ব্যক্তিগত রক্ষী এবং আশেপাশের ক্যাম্প থেকে মাত্র ১৫০-২০০ জন সেনা জোগাড় করে উরির দিকে রওয়ানা দেন। ২৪শে অক্টোবর উরিতে পৌঁছে তিনি মুজাফফরাবাদের দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু শত্রুপক্ষের বিশাল বাহিনীর সম্মুখে বেশিক্ষণ টিকতে না পেরে তিনি কৌশলগত ভাবে পশ্চাৎপশরন করে উরির একটি ব্রিজের অপরপ্রান্তে দুর্ভেদ্য বাঙ্কার নির্মাণ করে শক্তিশালী অবস্থান নেন।

যখন হানাদার বাহিনী ব্রিজ পার হওয়ার উপক্রম করছে, ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিং বিস্ফোরক দিয়ে সেই উরি ব্রিজটি উড়িয়ে দেন। এই একটি সিদ্ধান্ত শত্রুদের অগ্রগতি একদিনের জন্য পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়। কিন্তু শত্রুরা সংখ্যায় ছিল অগণিত। পরের দিন, ২৬শে অক্টোবর, শত্রুরা একটি ফুটব্রিজ দিয়ে নদী পার হয়ে মহুরা পাওয়ার স্টেশনের কাছে অবস্থানকারী কাশ্মীরি স্টেট সেনাদের ঘিরে ফেললো। ১ জনের বিপরীতে প্রায় ২০ থেকে ৫০ জন শত্রু! গ্রীসের স্পার্টার ৩০০ জন সেনাদের মতোই টানা দু'দিন ধরে নাওয়াখাওয়া ভুলে শত্রুর যাবতীয় আক্রমণ সফলতার সাথে প্রতিহত করে এই গুটিকয়েক সেনা উরিতে মাটি কামড়ে পড়ে থাকলো। এই দুটি দিনই ছিল কাশ্মীরের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যেই জম্মু ও কাশ্মীরের প্রতিনিধিরা নয়াদিল্লিতে উড়ে যান এবং ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তির চুক্তি (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন।

২৭শে অক্টোবর। গোলাবারুদ প্রায় শেষ, সেনাদলও ক্ষতবিক্ষত। বাধ্য হয়ে ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিং তাঁর বাকি বেঁচে থাকা সেনাদের নিয়ে বারামুলার দিকে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। বুনিয়ার (Buniyar)-এর কাছে পৌঁছাতেই শত্রুরা তাঁদের ওপর ব্যাপক গোলাগুলি বর্ষণ শুরু করে। এই অতর্কিত হামলায় ব্রিগেডিয়ারের গাড়ির চালক নিহত হন এবং একটি বুলেট এসে খোদ ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিংয়ের পায়ে বিদ্ধ হয়। তিনি আর নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। এই অবস্থায় তিনি তাঁর সেনাদের নির্দেশ দেন তাঁকে রাস্তার পাশে একটি পাথরের আড়ালে রেখে তারা যেন দ্রুত শ্রীনগরের দিকে পিছু হটে মহারাজার প্রাণ ও রাজধানী রক্ষা করে। নিজের রিভলবার হাতে নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পাথরের আড়ালে শুয়ে একাই তিনি শত্রুদের দিকে গুলি চালাতে থাকেন। শত্রুর গুলিতে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। মৃত্যুর পর তাঁকে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'মহাবীর চক্র' দিয়ে সম্মানিত করা হয়। নিজের প্রাণের বিনিময়ে কাশ্মীরকে বাঁচানোর যে অমূল্য সময় তিনি কিনে দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

(পরবর্তী পর্বে কাশ্মীরের যুদ্ধে ভারতীয় সেনার গ্র্যান্ড এন্ট্রি)

তথ্যসূত্র:
---------
১) অপারেশন গুলমার্গ ও মেজর ওঙ্কার সিং কালকাট: পাকিস্তান কীভাবে এই যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিল তার বিস্তারিত বর্ণনা মেজর কালকাটের নিজের লেখা বই "The Far-Flung Frontiers"-এ রয়েছে। থেকে তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতার কাহিনী পড়া যাবে। https://salute.co.in/the-brave-major-onkar-singh-kalkat/ থেকে তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতার কাহিনী পড়া যাবে।

২) মেজর সোমনাথ শর্মা (PVC): ভারতের প্রথম পরমবীর চক্র বিজয়ীর বীরত্বগাঁথা এবং বাদগাম যুদ্ধের বর্ণনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল পোর্টাল 'Honourpoint'-এ পাওয়া যাবে।
https://honourpoint.in/profile/major-somnath-sharma-pvc-2/

৩) ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্র সিং (MVC): উরি ব্রিজ ধ্বংস করে কাশ্মীরকে বাঁচানোর কাহিনী এবং তাঁর 'মহাবীর চক্র' পাওয়ার তথ্য এখানে পাবেন।
https://www.jammukashmirnow.com/Encyc/2023/10/26/Remembering-Saviour-of-Kashmir-Brigadier-Rajinder-Singh-Jamwal-on-his-martyrdom-day.html
৪) ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ উসমান (Lion of Naushera): নৌসেরা ও ঝাঙ্গার পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকা ও শাহাদাত বরণের কাহিনী।
https://honourpoint.in/profile/brigadier-mohammad-usman-mvc/
৫) অপারেশন বাইসন (জিলা পাস যুদ্ধ):
বিশ্বের অন্যতম উচ্চতায় ট্যাঙ্ক যুদ্ধের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের কথা প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং ইতিহাসবিদদের লেখায় বিস্তারিত আছে।
https://curiousindian.in/the-battle-of-zojila-operation-bison/
৬) অফিসিয়াল হিস্ট্রি: ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ঐতিহাসিক বিভাগ (History Division, MoD) দ্বারা প্রকাশিত "History of Operations in Jammu & Kashmir (1947-48)" বইটি এই যুদ্ধের সবচেয়ে অথেনটিক উৎস। এটি এস. এন. প্রসাদ এবং ধর্ম পাল দ্বারা সংকলিত।
৭) অমৃতসর চুক্তি (১৮৪৬): ডোগরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গুলাব সিংয়ের সাথে ব্রিটিশদের চুক্তির মূল নথি এবং তথ্যের জন্য https://nationalarchives.nic.in/ দেখা যেতে পারে।
৮) জম্মু-কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তি (Accession):
মহারাজা হরি সিং কর্তৃক ২৬শে অক্টোবর ১৯৪৭-এ স্বাক্ষরিত 'Instrument of Accession'-এর কপি এবং নেহেরুর কাছে তাঁর চিঠির প্রতিলিপি ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের (MEA) নথিপত্রে সংরক্ষিত আছে।

স্তেপের শার্দূল চেঙ্গিজ খান, পঞ্চম পর্ব=======================কাল্কার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মঙ্গোল, দ্বিতীয় পর্ব
30/12/2025

স্তেপের শার্দূল চেঙ্গিজ খান, পঞ্চম পর্ব
=======================
কাল্কার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মঙ্গোল, দ্বিতীয় পর্ব

স্তেপের শার্দূল চেঙ্গিজ খান, পঞ্চম পর্ব
=======================
কাল্কার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মঙ্গোল, দ্বিতীয় পর্ব
=============================
ষষ্ঠ অধ্যায়: কাল্কা নদীর তীরে – মৃত্যুর ফাঁদ
—------------------------------------------
১২২৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে মে। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে কাল্কা নদীর (Kalka River) জল চিকচিক করছিল। রুশ বাহিনী নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলো। মঙ্গোলরা নদীর অপর পারে, যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় অপেক্ষমাণ।

এখানে পুনরায় রুশ রাজন্যবর্গের মধ্যে বিবাদ শুরু হলো। কিয়েভের মস্তিস্লাভ রোমানোভিচ চাইলেন নদী পার না হয়ে এখানেই রক্ষণব্যূহ রচনা করতে। তিনি ছিলেন সতর্ক ও দূরদর্শী, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শত্রুকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু গ্যালিসিয়ার মস্তিস্লাভ এবং কুমানরা যুদ্ধের জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। তারা কিয়েভের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই নদী পার হতে শুরু করল। চেরনিগভের বাহিনীও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে তাদের অনুসরণ করল।

ফলস্বরূপ, রুশ বাহিনী তিনটি বিচ্ছিন্ন ও অসংলগ্ন অংশে বিভক্ত হয়ে গেল: ১. অগ্রবর্তী দল: কুমান ও গ্যালিসিয়ার বাহিনী (যারা নদী পার হয়ে মঙ্গোলদের ধাওয়া করল)। ২. মধ্যবর্তী দল: চেরনিগভের বাহিনী (যারা নদী পার হওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিল)। ৩. পশ্চাৎবর্তী দল: কিয়েভের বাহিনী (যারা নদীর পশ্চিম তীরে স্থির হয়ে রইল)।

সুবুতাই ঠিক এই মুহূর্তটির অপেক্ষাতেই ছিলেন। যখন রুশ বাহিনীর অর্ধেক নদী পার হয়েছে, কিন্তু কেউই সুবিন্যস্ত নয়, তখনই তিনি তাঁর তূণীরে হাত দিলেন।

যুদ্ধের শুরু: বিশৃঙ্খলা
—--------------------
মঙ্গোল বাহিনীর বিন্যাস ছিল নিখুঁত। সুবুতাই তাঁর ভারী অশ্বারোহী বাহিনীকে (Heavy Cavalry) প্রস্তুত রেখেছিলেন। সাধারণ মঙ্গোল যুদ্ধে তীরন্দাজরা আগে আক্রমণ করে, কিন্তু কাল্কায় সুবুতাই প্রথা ভাঙলেন। তিনি বজ্রের বেগে তাঁর লৌহবর্মাবৃত ভারী অশ্বারোহীদের লেলিয়ে দিলেন কুমানদের উপর।

কুমানরা ছিল হালকা বর্মধারী। মঙ্গোলদের বর্শা ও অশ্বের পদাঘাতে তারা মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। পলায়নপর কুমানরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পিছু হটতে গিয়ে ধাক্কা দিল পেছন থেকে আগুয়ান রুশ বাহিনীর উপর। গ্যালিসিয়া ও ভলিনিয়ার সৈন্যরা নিজেদের মিত্রদের দ্বারাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল। নিজেদের লোকের ভিড়েই তারা আটকে পড়ল।

এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে জেবে এবং সুবুতাই দুই দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ (Flanking Maneuver) পরিচালনা করলেন। মঙ্গোল তীরন্দাজরা বৃষ্টির মতো বাণ বর্ষণ শুরু করল। রুশ নাইটদের ভারী বর্ম ভেদ করে সেই বাণ বিদ্ধ হলো অশ্ব ও আরোহীর শরীরে। ধোঁয়া, ধূলি ও রক্তের বন্যায় কাল্কার তীর নরককুণ্ডে পরিণত হলো।

সম্মুখভাগের রুশ বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হলো। গ্যালিসিয়ার মস্তিস্লাভ কোনোমতে নদী পার হয়ে নৌকা ধ্বংস করে পলায়ন করলেন, যাতে মঙ্গোলরা পিছু নিতে না পারে—কিন্তু এতে তাঁর নিজ বাহিনীর অবশিষ্টাংশ নদীর তীরে আটকে পড়ে মরল। চেরনিগভের বাহিনীও এই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ছত্রভঙ্গ হলো। রাজপুত্ররা প্রাণ হারালেন, পতাকাদণ্ড লুণ্ঠিত হলো। আর এখানেই ঘটল বিপর্যয়।

বিপর্যয়ের মুহূর্ত
—--------------
পলাতক কুমেন বাহিনী নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পাগলের মতো ছুটছিল, আর তাদের ঠিক পিছনেই ধেয়ে আসছিল মঙ্গোলরা। এই বিশৃঙ্খল জনস্রোত সোজাসুজি ধাক্কা দিল নদী পার হতে থাকা রাশিয়ান বাহিনীর ওপর। রাশিয়ান সৈন্যরা তখনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, কেউ কেউ বর্ম পরছিল, কেউ ঘোড়ায় জিন লাগাচ্ছিল। কুমেনদের এই ধাক্কায় রাশিয়ানদের অগ্রবর্তী দল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। নিজেদের মিত্র বাহিনীর পায়ের তলায় পিষ্ট হলো অসংখ্য সৈন্য।

মঙ্গোলরা এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। তারা পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের তীরের বৃষ্টি আকাশ ঢেকে দিল। রাশিয়ানদের ভারী বর্মভেদ করে তীরগুলো বিদ্ধ হতে লাগল শরীরে। ম্সতিস্লাভ দ্য বোল্ড এবং তার বাহিনী তখনো সামলে ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু মঙ্গোলদের ক্ষিপ্র গতির কাছে তারা ছিল অসহায়।

সপ্তম অধ্যায়: রণক্ষেত্রের বিভীষিকা
—----------------------------------
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কাল্কা নদীর জল তখন রক্তের স্রোত। যুদ্ধের ময়দানে ধুলো, ধোঁয়া আর আর্তনাদ মিলেমিশে এক নরককুণ্ড তৈরি হয়েছে।

চেরনিগভের বাহিনী যখন নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন মঙ্গোলদের একটি দল তাদের ওপর পাশ থেকে আক্রমণ চালায়। তারা নদীর তীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ল। মঙ্গোলরা ধোঁয়ার বোমা ব্যবহার করে তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দিল এবং তারপর নির্দয়ভাবে কচুকাটা করল। রাশিয়ানদের দীর্ঘ বর্শা আর ভারী তলোয়ার মঙ্গোলদের চটপটে ঘোড়ার কাছে হার মানল।

সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য ছিল কিয়েভের প্রিন্স ম্সতিস্লাভ রোমানোভিচের। তিনি নদীর অপর পাড়ে একটি উঁচু টিলার ওপর নিজের শিবির স্থাপন করেছিলেন। তিনি দেখলেন তার চোখের সামনে গালিচিয়া এবং চেরনিগভের বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন না। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন রক্ষণাত্মক অবস্থানে থেকে তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন, অথবা পূর্বের বিবাদের কারণে তিনি অন্য প্রিন্সদের সাহায্য করতে চাননি। তার এই নিষ্ক্রিয়তা তাকে বাঁচাতে পারেনি, বরং তার মৃত্যুকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল।

গালিচিয়ার প্রিন্স ম্সতিস্লাভ দ্য বোল্ড কোনোমতে কিছু সৈন্য নিয়ে নদী সাঁতরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। কিন্তু পালাবার সময় তিনি নদীর ধারের সমস্ত নৌকা পুড়িয়ে দিলেন বা নষ্ট করে দিলেন, যাতে মঙ্গোলরা তাকে ধাওয়া করতে না পারে। এই স্বার্থপর সিদ্ধান্ত নদীর ওপারে আটকে থাকা হাজার হাজার সাধারণ সৈন্যের পালানোর পথ বন্ধ করে দিল। মঙ্গোলরা তাদের ঘিরে ধরল এবং নির্মমভাবে হত্যা করল।

অষ্টম অধ্যায়: কিয়েভের পতন ও তক্তার ভোজ
—----------------------------------------------
বাকি রইল কেবল কিয়েভের বাহিনী। তারা টিলার ওপর নিজেদের গরুর গাড়িগুলো দিয়ে একটি দুর্গ বা ব্যারিকেড তৈরি করেছিল। মঙ্গোলরা তাদের আক্রমণ করল, কিন্তু কিয়েভের সৈন্যরা তিন দিন ধরে বীরত্বের সাথে লড়াই করল। তাদের অবস্থান ছিল শক্তিশালী, এবং মঙ্গোলরা চাইছিল না অহেতুক সৈন্য ক্ষয় করতে।

তাই সুবুতাই আবার ছলনার আশ্রয় নিলেন। তাদের সাথে ছিল 'প্লোস্কিনা' (Ploskina) নামক এক ব্রডনিক (যাযাবর স্লাভ), যে মঙ্গোলদের পক্ষে ছিল। প্লোস্কিনা কিয়েভের প্রিন্সের কাছে গিয়ে বাইবেলের ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করে বলল, "আপনারা যদি আত্মসমর্পণ করেন, তবে মঙ্গোলরা আপনাদের সম্মান করবে। আপনাদের কোনো রক্তপাত হবে না, এবং আপনাদের মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হবে।"

কিয়েভের প্রিন্স এবং তার পারিষদবর্গ জল ও খাদ্যের অভাবে ধুঁকছিলেন। তারা এই প্রস্তাবে রাজি হলেন। তারা অস্ত্র সমর্পণ করে টিলা থেকে নেমে এলেন।

কিন্তু নির্দয় মঙ্গোলরা তাদের কথা রাখল—আক্ষরিক অর্থে। তারা বলেছিল "রক্তপাত" হবে না। তাই তারা প্রিন্সদের তলোয়ার দিয়ে কাটল না। মঙ্গোলরা বিজয় উৎসবের আয়োজন করল। তারা মাটিতে বিশাল কাঠের তক্তা বা পাটাতন পাতল। এই তক্তার নিচে তারা প্রিন্সদের এবং সেনাপতিদের জীবন্ত বেঁধে শুইয়ে দিল। তারপর সেই তক্তার ওপর হাজার হাজার মঙ্গোল সেনাপতি ও সৈন্য বসে ভোজ শুরু করল।

উপরে চলছে মদ্যপান, নাচ, গান আর উল্লাস। আর নিচে, সেই কাঠের পাটাতনের চাপে, শ্বাসরোধ হয়ে, হাড়-গোড় ভেঙে তিলে তিলে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু বরণ করলেন রাশিয়ার গর্বিত রাজকুমারগণ। মঙ্গোলরা তাদের কথা রেখেছিল—কোনো রক্তপাত হয়নি, কেবল হাড় ভাঙার শব্দ আর চাপা আর্তনাদ মিশে গিয়েছিল স্তেপের বাতাসে। পৈশাচিক এই ঘটনা ইতিহাসে "ভোজের নিচে মৃত্যু" বা "Feast on the Planks" নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

নবম অধ্যায়: পরাজয়ের কারণ ও ময়নাতদন্ত
—--------------------------------------------
কাল্কার যুদ্ধ ছিল রাশিয়ার ইতিহাসে এক অশনি সংকেত। কেন এত বিশাল বাহিনী নিয়েও রাশিয়ানরা হেরে গেল? এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. ঐক্যের অভাব: রাশিয়ান বাহিনী ছিল মূলত বিভিন্ন রাজ্যের সৈন্যদের একটি জোড়াতালি দেওয়া দল। তাদের কোনো একক 'সুপ্রিম কম্যান্ডার' বা সর্বাধিনায়ক ছিল না। তিনজন প্রধান প্রিন্স—গালিচিয়া, কিয়েভ এবং চেরনিগভ—প্রত্যেকে নিজের মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা ছিল তাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ।

২. গোয়েন্দা ব্যর্থতা: রাশিয়ানরা জানত না তারা কাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা মঙ্গোলদের কেবল আরেকটি সাধারণ যাযাবর দল মনে করেছিল। মঙ্গোলদের রণকৌশল, তাদের ম্যাঙ্গুদাই কৌশল, বা তাদের তীরের ক্ষমতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।

৩. রণকৌশলের সেকেলেপনা: ইউরোপীয় ভারী অশ্বারোহী যুদ্ধের যুগ তখন অস্তমিত হতে শুরু করেছে, কিন্তু রাশিয়ানরা তা বুঝতে পারেনি। তারা মনে করত ভারী বর্ম আর সম্মুখ সমরই যুদ্ধের শেষ কথা। কিন্তু মঙ্গোলদের গতিশীল যুদ্ধের (Mobile Warfare) কাছে এই সনাতন পদ্ধতি ছিল অচল।

৪. কূটনৈতিক ভুল: মঙ্গোল দূতদের হত্যা করা ছিল এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটি মঙ্গোলদের কেবল ক্ষিপ্ত করেনি, তাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিল এই পুরো বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করতে।

দশম অধ্যায়: প্রলয়ের পদধ্বনি
—-----------------------------
কাল্কার যুদ্ধের পর মঙ্গোলরা সাথে সাথে রাশিয়া পুরোপুরি দখল করেনি। তারা ভলগা বুলগেরিয়ার দিকে অগ্রসর হয় এবং পরে মঙ্গোলিয়ায় ফিরে যায়। সুবুতাই এবং জেবে তাদের 'গ্রেট রেইড' বা মহাবিযান শেষ করে চেঙ্গিস খানের কাছে রিপোর্ট করতে যান। জেবে অবশ্য ফেরার পথেই মারা যান।

রাশিয়ানদের জন্য, কাল্কার যুদ্ধ ছিল এক অমীমাংসিত রহস্যময় ট্র্যাজেডি। সাধারণ মানুষ ভাবল, এটি হয়তো ঈশ্বরের কোনো অভিশাপ। তারা ভাবল, এই পাপী তাতাররা (মঙ্গোলদের তারা তাতার বলত) যেমন এসেছিল, তেমনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। তারা আর ফিরবে না।

কিন্তু তারা ভুল ছিল। কাল্কার যুদ্ধ ছিল কেবল একটি মহড়া। একটি বিশাল ঝড়ের পূর্বাবাস। মাত্র ১৪ বছর পর, ১২৩৭ সালে, সুবুতাই ফিরে এসেছিলেন। এবার আর কোনো ছোট দল নিয়ে নয়, বরং বাতু খানের নেতৃত্বে 'গোল্ডেন হোর্ড' বা সোনালী বাহিনীর বিশাল সমুদ্র নিয়ে। সেই প্লাবনে কেবল কিয়েভ বা গালিচিয়া নয়, সমগ্র রাশিয়া ডুবে গিয়েছিল পরাধীনতার অন্ধকারে, যা স্থায়ী ছিল প্রায় আড়াইশ বছর।

কাল্কা নদীর তীরে যে রক্ত ঝরেছিল, তা ছিল মধ্যযুগের রাশিয়ার স্বাধীনতার শেষ সূর্যাস্ত। সেই যুদ্ধের কাহিনী আজও রাশিয়ার লোকগাথায়, গানে এবং ইতিহাসে এক দগদগে ক্ষত হয়ে বেঁচে আছে। এটি আমাদের শেখায়, কেবল শৌর্য-বীর্য দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না; যুদ্ধ জিততে হলে প্রয়োজন ঐক্য, কৌশল এবং শত্রুকে সঠিক মূল্যায়ন করার প্রজ্ঞা।

সেদিনের সেই স্তেপের বাতাস আজও কান পাতলে শোনায় মরে যাওয়া রাজকুমারদের আর্তনাদ আর মঙ্গোল ঘোড়ার খুরের সেই ভয়াল শব্দ, যা বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র।

একাদশ অধ্যায়: চেঙ্গিজ খানের অন্তিম প্রহর
—--------------------------------------------
যুদ্ধ শেষে চেঙ্গিজ বিজয়ীর বেশে ফিরে এলেন মঙ্গোলিয়ায়। কিন্তু তার সেনাপতি সুবুতাই আর জেব তখনো থামেননি। তারা ককেশাস পর্বতমালা পার হয়ে ঢুকে পড়লেন রাশিয়ায়। সেখানে কালকা নদীর তীরে রুস রাজাদের সম্মিলিত বাহিনীকে তারা এমনভাবে পরাজিত করলেন যে, ইউরোপের রাজদরবারগুলোতে ভয়ের শিহরণ খেলে গেল। যদিও এটি ছিল কেবল এক অনুসন্ধানমূলক অভিযান, কিন্তু তা দেখিয়ে দিল মঙ্গোলদের শক্তি কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

১২২৭ সাল। চেঙ্গিজ খানের বয়স তখন ছেষট্টি। তিনি আবার বেরোলেন অভিযানে, এবার লক্ষ্য জিয়া রাজ্যের অবাধ্যতা দমন। কিন্তু শরীরের বয়স আর যুদ্ধের ধকল তাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে তিনি গুরুতর আহত হলেন। জ্বর আর ব্যথায় জর্জরিত শরীর, কিন্তু মনের জোর তখনো অটুট।

মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্রদের ডাকলেন। তিনি জানতেন, তার মৃত্যুর পর এই বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ে ভাইদের মধ্যে বিবাদ হতে পারে। তিনি একটি তীর হাতে নিয়ে ভাঙলেন, তারপর একগুচ্ছ তীর একসঙ্গে নিয়ে ভাঙার চেষ্টা করলেন। দেখালেন, একা থাকলে ভাঙা সহজ, কিন্তু এক থাকলে কেউ তাদের পরাজিত করতে পারবে না। তিনি ওগেদাইকে তার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করলেন। জোচি ততদিনে মারা গেছেন, তাই সাম্রাজ্য ভাগ করে দিলেন বাকি পুত্রদের মধ্যে।

আগস্ট ১৮, ১২২৭। যে মানুষটি এক হাতে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, তিনি নিঃশব্দে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তার মৃত্যু ছিল এক গোপন অধ্যায়। তার ইচ্ছানুযায়ী, তাকে এমন এক গোপন স্থানে সমাহিত করা হলো, যার হদিশ কেউ কোনোদিন জানবে না। কথিত আছে, তার শবযাত্রায় যারা পথে পড়েছিল, তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছিল যাতে কবরের স্থান গোপন থাকে। হাজার হাজার ঘোড়া তার কবরের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে মাটির কোনো চিহ্ন না থাকে।

দ্বাদশ অধ্যায়: চেঙ্গিজ পরবর্তী মঙ্গোল সাম্রাজ্য
—----------------------------------------------
চেঙ্গিজ খান চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক বিশাল সাম্রাজ্য এবং এক অমোঘ উত্তরাধিকার। তিনি কেবল ধ্বংসই করেননি, তিনি সৃষ্টিও করেছিলেন। সিল্ক রোডকে তিনি নিরাপদ করেছিলেন, যার ফলে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে বাণিজ্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান সহজ হয়েছিল। তিনি চালু করেছিলেন ডাক ব্যবস্থা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং মেধার ভিত্তিতে প্রশাসনের নিয়ম।

শারদীন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ভাষায় বলতে গেলে—"ইতিহাসের পাতায় তিনি রক্তপিপাসু হিসেবে চিত্রিত হতে পারেন, কিন্তু স্তেপের ধুলিকণায় কান পাতলে আজও শোনা যায় এক অদম্য সাহসের গাথা। তিনি ছিলেন প্রকৃতির মতোই—কখনো শান্ত, কখনো বা প্রলয়ংকরী। তিনি চেঙ্গিজ খান, যাযাবরদের সম্রাট, যার তরবারির ছায়ায় একদিন অর্ধেক পৃথিবী ঢাকা পড়েছিল।"

চেঙ্গিজের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও পৌত্ররা—ওগেদাই, বাতু, হালাকু এবং কুবলাই খান—সেই সাম্রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেছিলেন। কিন্তু সেই গল্পের শুরু হয়েছিল এক এতিম বালকের হাত ধরে, যে নিজের ভাগ্যকে অস্বীকার করে ছিনিয়ে এনেছিল বিশ্বজয়ের মুকুট। স্তেপের বাতাসে আজও যেন তার কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়ায়—"আমিই সেই শাস্তি, যা তোমরা নিজেরাই ডেকে এনেছ।"
(সমাপ্ত)

চতুর্থ পর্বের লিঙ্ক: https://www.facebook.com/share/p/17ZT3p7P7Q/
তথ্যসূত্র: 1) The Mongol Art of War: Chinggis Khan and the Mongol Military System by Timothy May
2) Kings and Generals, YouTube

১২২৩ সালের ৩১শে মে। বর্তমান ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ওব্লাস্টে কালকা নদীর তীরে ঘনিয়ে এল এক ভয়াবহ প্রলয়!​একদিকে মৃত্যুভয়হীন দুর...
28/12/2025

১২২৩ সালের ৩১শে মে। বর্তমান ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ওব্লাস্টে কালকা নদীর তীরে ঘনিয়ে এল এক ভয়াবহ প্রলয়!

​একদিকে মৃত্যুভয়হীন দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনী, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন কিংবদন্তি সেনাপতি জেব আর সুবুতাই। আর তাঁদের রুখতে দাঁড়িয়েছে রুস প্রিন্সিপালিটি (কিয়েভ ও গ্যালিসিয়া-ভোলিনিয়া) এবং কোটেনের নেতৃত্বাধীন কুমানদের এক বিশাল যৌথ জোট। এই জোটের সেনাপতি ছিলেন দুই মহারথী—মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড এবং কিয়েভের তৃতীয় মস্তিস্লাভ।

​কালকা নদীর তীরে বেজে উঠল সেই রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের রণদামামা। তরবারির ঝনঝনানি আর রক্তের স্রোতে ভেসে গেল প্রান্তর। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। যুদ্ধের শেষে মোঙ্গলদের চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী জয়ে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। কালকার রক্তস্নাত ঐতিহাসিক মহাযুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে পড়ুন কালকার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মোঙ্গল, প্রথম পর্ব

স্তেপের শার্দূল চেঙ্গিজ খান, চতুর্থ পর্ব
=======================
কাল্কার মহাপ্রলয়: রুশ বনাম মঙ্গোল, প্রথম পর্ব
=============================
ভূমিকা: ঝড়ের পূর্বাভাস
—-----------------------
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিক। এশিয়ার বুক চিরে তখন জেগে উঠছে এক অদম্য শক্তি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। গোবি মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তর থেকে উঠে আসা এক যাযাবর জাতি, যাদের পায়ের তলার মাটি আর ঘোড়ার খুরের ধুলো একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে দিগন্তে। তারা মঙ্গোল। তাদের নেতা, চেঙ্গিস খান, তখন কেবল একজন মানুষ নন, বরং সাক্ষাৎ যমদূতের মতো পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছেন। কিন্তু এই কাহিনী চেঙ্গিস খানের নয়, এই কাহিনী তাঁর দুই বিশ্বস্ত ও ধূর্ত সেনাপতি—জেবে এবং সুবুতাই-এর, এবং তাদের সেই অবিশ্বাস্য অভিযানের, যা রাশিয়ার বুকে এক দগদগে ক্ষতের মতো চিরস্থায়ী হয়ে আছে।

সালটা ১২২৩ খ্রিস্টাব্দ। রাশিয়ার দক্ষিণ প্রান্তের বিস্তীর্ণ স্তেপ অঞ্চল বা তৃণভূমি তখনো জানে না, তাদের দিকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। এই ঝড় প্রকৃতির নয়, মানুষের তৈরি। এই ঝড়ের নাম 'কাল্কার যুদ্ধ'। এটি কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সভ্যতা, ভিন্ন রণকৌশল এবং ভিন্ন জীবনদর্শনের এক ভয়াবহ সংঘর্ষ। একদিকে রাশিয়ার গর্বিত রাজকুমারগণ, তাদের ভারী বর্ম, আভিজাত্যের অহংকার এবং ইউরোপীয় যুদ্ধের সনাতন রীতি; অন্যদিকে মঙ্গোলদের ক্ষিপ্রগতি, ছলনা, এবং মৃত্যুর মতো নীরব ও নির্ভুল তীরন্দাজি।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কেবল যুদ্ধের তারিখ বা হার-জিতের পরিসংখ্যান তুলে ধরা নয়। আমরা ফিরে যাব সেই সময়ে, অনুভব করব সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো, যখন কাল্কা নদীর জল মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। আমরা বিশ্লেষণ করব সেই রণকৌশল, যা সংখ্যায় কম হয়েও মঙ্গোলদের এনে দিয়েছিল অবিশ্বাস্য বিজয়। এটি একটি ঐতিহাসিক দলিলায়ন, যা উপন্যাসের রোমাঞ্চ নিয়ে পাঠককে নিয়ে যাবে মধ্যযুগের সেই ভয়াল রণক্ষেত্রে।

প্রথম অধ্যায়: মঙ্গোল রণযন্ত্র – এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ
—---------------------------------------------------
কাল্কার যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে মঙ্গোলদের যুদ্ধের কৌশল। ইউরোপ, রাশিয়া আর ভারতের পৃথ্বীরাজ চৌহান সহ অনান্য রাজপুত রাজাদের কাছে যুদ্ধ ছিল সম্মুখ সমরের বীরত্ব। কিন্তু মঙ্গোলদের কাছে যুদ্ধ ছিল এক ধরণের শিকার। তারা শত্রুকে মানুষ বলে গণ্য করত না, গণ্য করত শিকারের পশু হিসেবে।

অশ্বারোহী বাহিনী: ঝড়ের গতি
—-----------------------------
মঙ্গোল বাহিনীর মেরুদণ্ড ছিল তাদের ঘোড়া। মঙ্গোল ঘোড়াগুলো আকারে ছোট হলেও ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সহনশীল। একজন মঙ্গোল যোদ্ধা কেবল ঘোড়ায় চড়ত না, সে ঘোড়ার পিঠেই বড় হতো। তাদের বলা হতো "সেন্টর" বা অশ্বমানব। যুদ্ধের সময় প্রতিটি মঙ্গোল যোদ্ধার সাথে থাকত একাধিক ঘোড়া (প্রায় তিন থেকে চারটি)। একটি ঘোড়া ক্লান্ত হলে তারা চলন্ত অবস্থাতেই লাফিয়ে অন্য ঘোড়ায় উঠে পড়ত। এর ফলে তারা দিনে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারত, যা তৎকালীন অন্য কোনো সেনাবাহিনীর পক্ষে ছিল অকল্পনীয়। এই অতিমানবীয় গতিই ছিল তাদের বিজয়ের অন্যতম চাবিকাঠি। শত্রুপক্ষ খবর পাওয়ার আগেই মঙ্গোলরা তাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলত।

ধনুর্বিদ্যা: দূর থেকে মৃত্যু
—-----------------------
মঙ্গোলদের প্রধান অস্ত্র ছিল তাদের 'কম্পোজিট বো' বা যৌগিক ধনুক। কাঠ, শিং এবং প্রাণীর পেশীতন্তু দিয়ে তৈরি এই ধনুকগুলো ছিল ছোট কিন্তু মারাত্মক শক্তিশালী। ঘোড়ার পিঠে পূর্ণ গতিতে ছুটে চলার সময়ও মঙ্গোলরা শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে নির্ভুল নিশানায় তীর ছুড়তে পারত। তাদের তীরের পাল্লা ছিল রাশিয়ান বা ইউরোপীয় ধনুকের চেয়ে অনেক বেশি। তারা এমন এক ধরণের তীর ব্যবহার করত যা ভারী বর্ম ভেদ করতে সক্ষম ছিল।

তাদের রণকৌশলের একটি বিশেষ দিক ছিল 'পার্থিয়ান শট' বা পশ্চাদপসরণের ভান করে পিছন ফিরে তীর ছোড়া। শত্রু যখন ভাবত মঙ্গোলরা ভয় পেয়ে পালাচ্ছে, তখন তারা উল্লাসে ধাওয়া করত, আর তখনই মঙ্গোলরা ঘোড়ার পিঠে উল্টো ঘুরে বৃষ্টির মতো তীর ছুড়ে শত্রুকে ধরাশায়ী করত।

শৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা
—------------------------
রাশিয়ার রাজাদের সেনাবাহিনী ছিল সামন্ততান্ত্রিক। সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বীরত্ব প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা ছিল বেশি। কিন্তু মঙ্গোল বাহিনী ছিল একটি নিখুঁত যন্ত্রের মতো। সেখানে একক বীরত্বের চেয়ে দলগত শৃঙ্খলা ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা দশমিক পদ্ধতিতে সংগঠিত ছিল—দশ, শত, সহস্র এবং অযুত (তুমান)। যুদ্ধের ময়দানে কোনো প্রকার শব্দ না করে কেবল নিশান বা পতাকার সংকেতে হাজার হাজার সৈন্য মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করতে পারত।

তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। আক্রমণের আগে তারা বণিক বা পর্যটকদের ছদ্মবেশে গুপ্তচর পাঠাত। শত্রুর দুর্বলতা, রসদ ভাণ্ডার, এবং রাজনৈতিক বিরোধ—সবকিছুই তাদের নখদর্পণে থাকত। কাল্কার যুদ্ধের আগেও সুবুতাই জানতেন যে রাশিয়ার রাজকুমারদের মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে, এবং তিনি সেই ফাটলটিকেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়: কিয়েভান রাশ – অহংকার ও বিভেদ
—---------------------------------------------------
ককেশাসের ওপারে কৃষ্ণমেঘ
—----------------------------
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্ন। এশিয়ার বক্ষপিঞ্জর ভেদ করে এক ভয়াবহ ঝড়ের উৎপত্তি হয়েছিল, যার নাম চেঙ্গিস খান। কিন্তু এই কাহিনী চেঙ্গিস খানের নয়, এই কাহিনী তাঁরই দুই কালান্তক অনুচর—জেব এবং সুবুতাইয়ের। খোয়ারজিম সাম্রাজ্যের পতন তখন সম্পূর্ণ। সমরকন্দ ও বুখারার সমৃদ্ধি এখন ধূলিসাৎ, নরপতির দম্ভ চূর্ণ হয়েছে মঙ্গোল অশ্বখুরের আঘাতে। কাস্পিয়ান সাগরের তীরে এক নির্জন দ্বীপে খোয়ারজিম অধিপতি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তখন দিগন্তে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা যেন এক নতুন প্রলয়ের ইঙ্গিত বহন করে আনল।

চেঙ্গিস খান তখনো তাঁর ক্রোধ সংবরণ করেননি। তিনি তাঁর দুই বিশ্বস্ত সেনাপতিকে আহ্বান করলেন। জেব, যাকে বলা হয় 'তীর', এবং সুবুতাই, যিনি 'লৌহকুকুর' নামে খ্যাত—তাঁরা এসে আনত মস্তকে আদেশের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। চেঙ্গিস খান বললেন, "পশ্চিমের দ্বার উন্মুক্ত। যাও, দেখে এসো সেই অজ্ঞাত ভূখণ্ডে আর কোন শক্তি লুকিয়ে আছে। তবে মনে রেখো, তিন বছরের মধ্যে ফিরে আসা চাই।"

মাত্র কুড়ি হাজার অশ্বারোহী নিয়ে দুই সেনাপতি যাত্রা শুরু করলেন। এই কুড়ি হাজার যোদ্ধা কেবল সংখ্যায় নয়, শৌর্য ও রণকৌশলে ছিল তৎকালীন বিশ্বের ত্রাস। তাদের অশ্বগুলি ছিল খর্বকায় কিন্তু বিদুৎগতিসম্পন্ন, আর তাদের ধনু ছিল যমদূতের মতো অব্যর্থ। খোয়ারজিম ধ্বংসের পর এই বাহিনী যখন ককেশাসের পানে ধাবিত হলো, তখন ধরিত্রী যেন প্রমাদ গুনল।

শীতকাল। ১২২১ খ্রিষ্টাব্দ। জর্জিয়ার পার্বত্য উপত্যকায় তখন তুষারপাত শুরু হয়েছে। জর্জিয়ার রাজা চতুর্থ জর্জ তখন যৌবনের মদে মত্ত। তাঁর গর্ব ছিল তাঁর লৌহবর্মাবৃত ভারী অশ্বারোহী বাহিনী বা 'নাইট'-দের নিয়ে। তিনি ভাবলেন, এই জাজাবর দস্যুরা তাঁর সুশিক্ষিত বাহিনীর সামনে ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে। কিন্তু তিনি জানতেন না, যাদের সঙ্গে তিনি যুদ্ধে লিপ্ত হতে চলেছেন, তারা সাধারণ দস্যু নয়—তারা যুদ্ধের এক নতুন ব্যাকরণ রচয়িতা।

সুবুতাই জানতেন, জর্জিয়ার ভারী অশ্বারোহীদের সম্মুখ সমরে পরাস্ত করা কঠিন। তাই তিনি আশ্রয় নিলেন তাঁর চিরপরিচিত 'কূটকৌশল'-এর। মঙ্গোল বাহিনী জর্জিয়ানদের দেখামাত্র তীর বর্ষণ করে সহসা পশ্চাদপসরণ শুরু করল। জর্জিয়ান নাইটরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। তারা ভাবল, ভীরু যাযাবররা পালাচ্ছে। অশ্বের রাশ আলগা করে তারা মঙ্গোলদের পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু এটাই ছিল সুবুতাইয়ের পাতা ফাঁদ। যখন জর্জিয়ান বাহিনী ক্লান্ত এবং বিচ্ছিন্ন, ঠিক তখনই মঙ্গোল অশ্বারোহীরা অশ্বের মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল। পলায়নপর হরিণ মুহূর্তেই নেকড়ের রূপ ধারণ করল। মঙ্গোলদের তূণীরের অগণিত শর জর্জিয়ান নাইটদের বিদ্ধ করতে লাগল। তুষারশুভ্র প্রান্তর রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। জর্জিয়ার গর্ব সেই দিন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল।

তৃতীয় অধ্যায়: পর্বতের ছলনা ও বন্ধুত্বের বিষ
—--------------------------------------------
জর্জিয়া জয়েই মঙ্গোলদের তৃষ্ণা মিটল না। তারা ককেশাস পর্বতমালা অতিক্রম করে আরও উত্তরে অগ্রসর হওয়ার সংকল্প করল। কিন্তু এই পথ ছিল কন্টকাকীর্ণ। পর্বতের ওপারে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক বিশাল জোট। লেজগিন, সার্কাশিয়ান, এবং কিপচাক (যাদের রুশের অধিবাসীরা 'কুমান' বা 'পোলভত্সিয়ান' বলত)—এই পার্বত্য ও যাযাবর জাতিগোষ্ঠীগুলি একত্রিত হয়ে মঙ্গোলদের পথরোধ করল। সংখ্যায় তারা ছিল মঙ্গোলদের দ্বিগুণ। যাযাবর হবার কারনে এদের রণনীতিও ছিল অনেকটা মঙ্গোলদের মতোই।

সুবুতাই দেখলেন, বলপ্রয়োগে এই ব্যূহ ভেদ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি ব্যবহার করলেন সেই অস্ত্র, যা তলোয়ারের চেয়েও ধারালো—বুদ্ধি। তিনি লক্ষ্য করলেন, এই জোটের মধ্যে কিপচাকরা জাতিতে তুর্কি এবং যাযাবর, মঙ্গোলদের সঙ্গে তাদের রক্তের সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি গোপনে কিপচাক দলপতির কাছে দূত পাঠালেন।

দূত গিয়ে বলল, "হে ভ্রাতৃবৃন্দ, আমরা তো একই আকাশের নিচে পালিত যাযাবর। আমাদের রক্ত এক, জীবন এক। তোমরা কেন ওই পার্বত্য কৃষিজীবী ও নগরবাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছ? ওরা আমাদের শত্রু। তোমরা যদি আমাদের পথ ছেড়ে দাও, তবে জর্জিয়া থেকে লুণ্ঠিত সমস্ত ধনরত্ন আমরা তোমাদের উপহার দেব।"

কিপচাকরা প্রলোভনে পড়ল। স্বর্ণ ও রত্নের দ্যুতি তাদের অন্ধ করে দিল। তারা ভাবল, মঙ্গোলরা তো চলেই যাচ্ছে, অকারণে রক্তক্ষয় করে কী লাভ? তারা জোট ত্যাগ করে নিজের বাড়ি ফিরে গেল। জোট ভেঙে পড়ল। নিঃসঙ্গ লেজগিন ও সার্কাশিয়ানরা মঙ্গোলদের আক্রমণের মুখে খড়কুটার মতো ভেসে গেল। সুবুতাইয়ের বাহিনী নির্মমভাবে তাদের হত্যা করল।

কিন্তু নাটকের শেষ অঙ্ক তখনো বাকি ছিল। কিপচাকরা যখন লুণ্ঠিত ধনের স্বপ্ন দেখছে, তখন মঙ্গোলরা বিদ্যুৎগতিতে তাদের পিছু ধাওয়া করল। সুবুতাইয়ের নীতি ছিল সরল—বিশ্বাসঘাতককে বিশ্বাস করতে নেই, আর শত্রুকে জীবিত রাখতে নেই। অরক্ষিত কিপচাকদের ওপর মঙ্গোল বাহিনী ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ল। যারা বন্ধু ভেবে পথ ছেড়ে দিয়েছিল, তারাই এখন মঙ্গোল অসির আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড হতে লাগল। কিপচাক দলপতি কোতিয়ান খান কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালালেন। তাঁর পেছনে পড়ে রইল তাঁর স্বজাতির ছিন্নভিন্ন দেহ ও জ্বলন্ত গ্রাম।

চতুর্থ অধ্যায়: রুশের দ্বারে অশনি সংকেত
—-----------------------------------------
প্রাণভয়ে ভীত কোতিয়ান খান পালিয়ে এলেন তাঁর জামাতা, গ্যালিসিয়ার যুবরাজ 'মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড' বা 'সাহসী মস্তিস্লাভ'-এর দরবারে। ছিন্নবস্ত্র, ধূলিমলিন শরীরে তিনি যখন রুশ রাজসভায় প্রবেশ করলেন, তখন এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা নেমে এল। কোতিয়ান খান আর্তনাদ করে বললেন, "আজ ওরা আমাদের ভূমি গ্রাস করেছে, কাল ওরা তোমাদের ভূমি কেড়ে নেবে। এই যাযাবররা মানুষ নয়, ওরা নরকের কীট। এখনই যদি আমরা একত্রিত না হই, তবে রুশের পবিত্র মাটি শীঘ্রই মঙ্গোল অশ্বখুরে দলিত হবে।"

সেই সময় রাশিয়া জার সম্রাটদের দ্বারা শাসিত কোনো অখণ্ড সাম্রাজ্য ছিল না। 'কিয়েভান রুস' ছিল বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের সমষ্টি। প্রতিটি রাজ্যের অধিপতি ছিলেন এক একজন রাজপুত্র বা 'প্রিন্স'। এই রাজপুত্রদের মধ্যে ঐক্যের অভাব ছিল প্রবল, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাঁরা সর্বদা লিপ্ত থাকতেন। কিন্তু কোতিয়ান খানের মুখে মঙ্গোল দূতদের বিশ্বাসঘাতকতা আর মঙ্গোল সেনাদের পৈশাচিক বর্বরতার কাহিনী শুনে তাঁরা শিহরিত হলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই বিপদ একার নয়, সকলের।

কিয়েভ নগরে এক মহাসম্মেলন ডাকা হলো। সেখানে উপস্থিত হলেন রুশের তিন প্রধান স্তম্ভ—কিয়েভের মস্তিস্লাভ, চেরনিগভের মস্তিস্লাভ এবং গ্যালিসিয়ার মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড। ইতিহাসের পাতায় তাঁরা 'তিন মস্তিস্লাভ' নামে পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন ভলিন, স্মোলেনস্ক এবং অন্যান্য অঞ্চলের অধিপতিরা। তাঁদের সম্মিলিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় আশি হাজার—তৎকালীন সময়ের হিসেবে এক বিশাল সমুদ্রসম বাহিনী। মঙ্গোলদের কুড়ি হাজার অশ্বারোহীর বিরুদ্ধে এই সংখ্যা ছিল অকল্পনীয়।

এরপর মঙ্গোলরা দ্বিতীয়বার দূত পাঠাল, যারা এসে ঘোষণা করল, "আপনারা যখন যুদ্ধের পথই বেছে নিয়েছেন এবং আমাদের দূত হত্যা করেছেন, তবে তাই হোক। ঈশ্বর সাক্ষী, আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে চাইনি। কিন্তু এখন, যুদ্ধই আপনাদের ভাগ্য।"

পঞ্চম অধ্যায়: যাত্রা এবং প্রথম বিভ্রান্তি
—--------------------------------------
১২২৩ সালের এপ্রিল মাস। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সৈন্যরা সমবেত হতে শুরু করল। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সম্মিলিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০,০০০ (যদিও সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে)। এটি ছিল এক বিশাল বাহিনী। কিয়েভ, গালিচিয়া, চেরনিগভ, ভলিনিয়া—সমস্ত রাজ্যের পতাকা উড়ছে বাতাসে। তাদের সাথে যোগ দিল কুমেনদের অশ্বারোহী বাহিনী।

রুশ ও কুমানদের সম্মিলিত বাহিনী যখন দিনিপার (Dnieper) নদীর তীরে সমবেত হলো, তখন মঙ্গোলরা পুনরায় তাদের কুটনীতির খেলা খেলল। মঙ্গোল দূতরা রুশ শিবিরে এসে বিনীতভাবে বলল:
"হে মহান রুশ অধিপতিগণ, আমাদের বিবাদ তো আপনাদের সঙ্গে নয়, আমাদের শত্রু ওই কুমানরা। ওরা আপনাদেরও বহু ক্ষতি করেছে, আপনাদের গ্রাম লুণ্ঠন করেছে। আপনারা কেন অনর্থক ওদের পক্ষ নিচ্ছেন? আমরা আপনাদের সঙ্গে মৈত্রী চাই।"

রুশ রাজপুত্রদের আত্মবিশ্বাস ছিল গগনচুম্বী। তাঁরা ভাবলেন, “কিপচাকদের বিরুদ্ধে মঙ্গোল দূতেরা যেমন ছলনা করেছিল, এরাও তেমনই গুপ্তচর। তাছাড়া এই বন্য তাতাররা তাঁদের সুশিক্ষিত ও বর্মাবৃত 'দ্রুজিনা' (রাজকীয় দেহরক্ষী) বাহিনীর সামনে কতক্ষণই বা আর টিকবে?” তাই তাঁরা যুদ্ধের প্রাক্কালে এক গর্হিত অপরাধ করে বসলেন। ক্রুদ্ধ রুশ রাজপুত্ররা সেই মঙ্গোল দূতদের তৎক্ষণাৎ হত্যা করলেন।

মঙ্গোলদের কাছে দূতের হত্যা ছিল ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ। চেঙ্গিস খানের আইনে এর একমাত্র শাস্তি—মৃত্যু এবং ধ্বংস। রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাত খুঁজতে থাকা যুদ্ধবাজ সুবুতাই যখন এই সংবাদ পেলেন, তখন তাঁর চোখ থেকে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হলো। তিনি শপথ করলেন, এই ধৃষ্টতার প্রতিশোধ তিনি নেবেনই। এটি আর কেবল রাজ্য জয়ের যুদ্ধ রইল না, এটি পরিণত হলো এক পবিত্র রক্তশপথের সংগ্রামে।

গ্যালিসিয়ার মস্তিস্লাভ দ্য বোল্ড তাঁর বাহিনী নিয়ে দিনিপার নদী পার হলেন এবং মঙ্গোলদের সম্মুখভাগের একটি ক্ষুদ্র দলকে আক্রমণ করলেন। মঙ্গোলরা সামান্য প্রতিরোধ করে পলায়ন করল। রুশরা উল্লসিত হলো। তারা ভাবল, এই তাতাররা তো ভীরু! তাদের সেনাপতিকে ধৃত ও হত্যা করা হলো।

এই প্রাথমিক বিজয়ই ছিল রুশদের জন্য কালস্বরূপ। তারা জানত না, মঙ্গোলরা ইচ্ছা করেই হারছে। সুবুতাই ও জেবে তাদের মূল বাহিনী নিয়ে ধীরে ধীরে পেছাতে শুরু করলেন। রুশ বাহিনী বিজয়ের মদে মত্ত হয়ে তাদের পিছু নিল।

একদিন নয়, দুইদিন নয়—টানা নয় দিন ধরে চলল এই ধাবন। মঙ্গোলরা কেবল পেছাতেই থাকল, যেন তারা ভীত সন্ত্রস্ত হরিণের দল। কিন্তু আসলে তারা রুশ বাহিনীকে গভীর স্তেপের নির্জন প্রান্তরে টেনে আনছিল, যেখানে রুশদের রসদ মিলবে না। এই দীর্ঘ যাত্রায় রুশ বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সবচাইতে বড় বিপর্যয় ঘটল তাদের বিন্যাসে। দ্রুতগামী কুমান ও গ্যালিসিয়ান অশ্বারোহীরা অনেক দূর এগিয়ে গেল, আর কিয়েভ ও চেরনিগভের ভারী পদাতিক ও রসদবাহী গাড়িগুলি অনেক পশ্চাতে পড়ে রইল। রুশ বাহিনীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, ঠিক যেমনটি সুবুতাই চেয়েছিলেন।
(এরপর পরবর্তী পর্বে)
তৃতীয় পর্বের লিঙ্ক: https://www.facebook.com/share/p/16SDEgp74A/

Address

Kolkata

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when বিশ্বের সামরিক ইতিহাস আর অজানা রহস্য posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category