29/11/2025
মীরকাশিমের গোপন সেনা–সংস্কার: বাংলা ইতিহাসের অজানা অধ্যায়।
নবাব হয়ে মীরজাফর সিংহাসনে বসার পর সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ তাঁকে সদলবলে নিমন্ত্রণ করে ইউরোপীয় সমরকৌশলের একটি বিশেষ প্রদর্শন করেন। দ্রুত গতির মার্চ, নিখুঁত অস্ত্র চালনা, শৃঙ্খলাবদ্ধ রণপদ্ধতি—এসব প্রত্যক্ষ করে মীরজাফর বিস্মিত হয়ে জামাতা মীরকাশিমকে বলেন, “ইউরোপীয় সমরকৌশল অনুকরণযোগ্য।”
এই কথাটি মীরকাশিমের মনে গভীর দাগ কাটে।
সময় ও সুযোগ পেয়ে তিনি পুরোদমে সৈন্যসংগঠন ও অস্ত্রউৎপাদনের কাজে মনোনিবেশ করেন। পুরাতন কেল্লাগুলো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি দেশীয় দক্ষ কারিগরদের সাহায্যে গুলি, গোলা, বারুদ, কামান ও বন্দুক তৈরি শুরু করেন। ইউরোপীয় ধাঁচে সৈন্যদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং এক শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী গঠনের দিকে অগ্রসর হন।
অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণের জন্য পৃথক যন্ত্রশালা (ওয়ার্কশপ) স্থাপন করা হয়। বন্দুকের নাল তাপসহ করার জন্য উৎকৃষ্ট লোহার প্রয়োজন ছিল—রাজমহলের চকমকি লোহা ও ছোটনাগপুরের উৎকৃষ্ট লৌহ সেই চাহিদা পূরণ করে দ্রুতই খ্যাতি লাভ করে।
পরবর্তীতে ইংরেজরা এই বন্দুক পরীক্ষা করে দেখে—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বন্দুকের চেয়েও মীরকাশিমের বন্দুক মানে উৎকৃষ্ট।
কামান তৈরিতে মীরকাশিম নতুনত্ব দেখান—পিত্তল গলিয়ে ঢালাই করে কামান নির্মাণ শুরু হয়, যা বাংলার সামরিক প্রযুক্তিতে এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি।
ইংরেজদের চোখ এড়িয়ে বিভিন্ন স্বাধীন ইউরোপীয় বণিক—বিশেষত খোজা পিদ্রু—মীরকাশিমকে গোপনে উৎকৃষ্ট মানের বন্দুক, কামান ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে দেন। পিদ্রুর ভাই গ্রেগরী নবাবের প্রধান সেনাপতি হন এবং ইতিহাসে গরগিন খাঁ নামে পরিচিত। তাদের মাধ্যমে বহু আরমানী (Armenian) সৈনিক মীরকাশিমের বাহিনীতে যোগ দেন, যা বাহিনীর দক্ষতা ও শৃঙ্খলা বাড়ায়।
নবাবের উল্লেখযোগ্য ইউরোপীয় সেনাপতিদের মধ্যে মার্কার ও সামরু (ওয়াল্টার রেনল্ড) উল্লেখযোগ্য। সাধারণ সৈনিকদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহম্মদ তকী খাঁকে। তাঁর অধীনে সেনাদের চারটি পদে ভাগ করা হয়—
কমান্ডার, সুবেদার, জমাদার ও হাবিলদার।
সেনার পলায়ন রোধে একটি কঠোর পদ্ধতি চালু হয়—প্রতি দশজন সৈন্যের পেছনে একজন করে সশস্ত্র সিপাহী রাখা হতো। যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ পলায়নের চেষ্টা করলে সেই সিপাহীর দায়িত্ব ছিল তাকে সঙ্গে সঙ্গে দণ্ডিত করা।
এইভাবেই মীরকাশিম স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলার জন্য একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, যা তাঁর সময়ে বাংলার সর্বোচ্চ সামরিক পুনর্গঠনের নিদর্শন হয়ে ওঠে।
©Manas Bangla
#মীরকাশিম #বাংলারইতিহাস #আরমানী_বণিক #গরগিনখাঁ #মানসবাংলা