02/07/2026
গল্পঃ মায়ার_সংসার
লেখিকাঃ মিশু
পর্বঃ (২ও শেষ )
বাবার মুখে ওই কথাগুলো শুনে আমি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলাম। শাশুড়ী মা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বললেন, "এসব কি বলছেন বেয়াই? বিয়ে কি খেলা নাকি যে হুটহাট করে সব শেষ করে দেবেন?"
বাবা শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "বিয়ে অবশ্যই খেলা নয়, কিন্তু সেটা কোনো জেলখানাও নয়। আমার মেয়েকে আমি মানুষের মতো বড় করেছি, দাসী হওয়ার জন্য নয়। আরহামের ওপর আমার অনেক ভরসা ছিল, কিন্তু যে ছেলে স্ত্রীর আত্মসম্মানের চেয়ে মায়ের অন্যায় আবদারকে বড় করে দেখে, সে কখনো একজন ভালো জীবনসঙ্গী হতে পারে না।"
আমি এই ফাকে ব্যাগ গুছিয়ে বাইরে আসলাম। ঠিক তখনই আরহামের কল ভেসে উঠলো আমার ফোনে। সম্ভবত বাড়ি থেকে কেউ ফোন করে তাকে সবটা জানিয়েছে। আমি ফোন রিসিভ করতেই বাড়ির গেটে আমাকে বাবার সাথে ব্যাগ হাতে দেখে সে থমকে যায়।
আরহামের চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে দ্রুত গতিতে বলে, "রিয়া, এসব কী করছ? মা যা বলেছে একটু মানিয়ে নিলেই তো হতো! তুমি কি বুঝছ না এতে আমাদের মানসম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে?"
আমি সোজা আরহামের চোখের দিকে তাকালাম। আমার কণ্ঠ তখন অনেক বেশি স্থির, "মানসম্মান তো তখনই ধুলোয় মিশে গিয়েছিল আরহাম, যখন তুমি আমাকে একটা ঘরের অধিকারের জন্য লড়াই করতে দেখেও পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলে। তুমি তোমার নিজের প্রাইভেসি চেয়েছ সবসময় আমার থেকে, আর আমার বেলাতেই তোমার সব নিয়ম বদলে গেল? আমি কোনো অবাস্তব আবদার করিনি, আমি চেয়েছিলাম আমার প্রয়োজনীয় অধিকারটুকু। কিন্তু তুমি সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের সম্পর্কের চেয়ে তোমার মায়ের অন্যায়কে বড় করে দেখালে।"
আরহাম কিছু বলার আগেই বাবা আমার হাত ধরে গেটের দিকে নিয়ে চললেন। মেজো ভাবী দূর থেকে করুণ চোখে তাকিয়ে রইলেন, সম্ভবত আমার এই বেরিয়ে আসাটা তাকে নিজের অসহায়ত্বের কথা আরও একবার মনে করিয়ে দিল।
গাড়িতে ওঠার আগে আমি একবার পেছন ফিরে তাকালাম। সেই বাড়িটা, যেটাকে এতদিন 'আমার সংসার' ভাবার স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা এখন বড় অচেনা মনে হচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পথে বাবা আমাকে আগলে ধরে বললেন, "ভুল মানুষের সাথে জীবন কাটানোর চেয়ে একা থাকা অনেক সম্মানের। তুই ভেঙে পড়িস না মা, তোর জীবনের নতুন শুরু আজ থেকেই।"
এক মাস পর।
নিজের পুরোনো রুমে বসে জানালার বাইরের আকাশটা দেখছি। বাবার প্রশ্রয়ে এবং নিজের ইচ্ছাশক্তিতে আমি আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেছি। আরহামের কাছ থেকে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠাতে আমার দেরি হয়নি। সে অনেকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে, ক্ষমা চেয়ে দীর্ঘ মেসেজ পাঠিয়েছে, কিন্তু আমি আর ফিরে যাইনি।
মেজো ভাবীর সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। তিনি জানান, আমার চলে যাওয়ার পর ওই বাড়িতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি যে সাহসটুকু দেখিয়েছিলাম, তা দেখে মেজো ভাবীও এখন তার অধিকারের কথা বলতে শিখেছেন।
এরপর প্রায় একবছর পর।আমি বাইরে বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম৷। এরমধ্যো আরহামের সাথে আর যোগাযোগ করিনি।কিন্তুু মন থেকে ওকে ভুলতেও পারিনি হঠাৎ মনেহলো রাস্তায় আরহাম দাড়িয়ে। ও কিভাবে আসবে বলে মনের ভুল ভেবে আনমনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ ভুতের মতো সামনে দাড়ায় আরহাম। ওকে হঠাৎ দেখে আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারি না। ওকে আমার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলে, একবার ভুল করে হাত ছেয়ে দিয়েছিলাম এইবার আর ছাড়ছি না। আমি কিছু বলতে গেলে ঠোঁটে হাত রেখে বলে, তোমাকে কিছু বলতে হবে না। যা বলার এবার আমি বলবো। বাড়ির ভেতরে বাবা আছেন?
আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললাম। আরহাম মুচকি হেসে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। আমি সেই দিকে চেয়ে
বুঝতে পারলাম, 'মায়ার সংসার' শুধু চার দেয়ালের ভেতর থাকে না। যেখানে ভালোবাসা নেই, সম্মান নেই, সেখানে মায়া নামক শিকল দিয়ে আটকে থাকাটাই হলো সবচেয়ে বড় অভিশাপ।৷ আমি এখন মুক্ত, আমি এখন সুখী। আমার জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে আমিই আমার প্রধান চরিত্র, আর আমি সেই চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে ভীষণ গর্বিত।
— সমাপ্ত —