10/02/2025
আজ ১০ই ফেব্রুয়ারী।
৩৪ তম উসমানী সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (রহ) এর ১০৭ তম ওফাত বার্ষিকী আজ।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (রহ) ১৬ই শাবান ১২৫৮ হিজরী মোতাবেক ২২ সেপ্টেম্বর ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তোপকাপি প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা- ৩১ তম উসমানী সুলতান আবদুল মাজিদ খান।
মাতা- তিরমুশকান কাদিন।
আবদুল হামিদের বাল্যাবস্থায় তার মা মারা গেলে তিনি সৎ মা "পেরেস্তু কাদীন" এর লালন পালনে বেড়ে ওঠেন। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তার এই সৎ মাকে খুবই ভালোবাসতেন এবং নিজের মায়ের মতই সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন।
যেহেতু "পেরেস্তু কাদীন" নিঃসন্তান ছিলেন, আর সুলতান আবদুল হামিদও তাকে নিজের আপন মায়ের মতই মর্যাদা দিতেন, তাই সুলতান আবদুল হামিদ সিংহাসনে আরোহণের পর তার সৎমা "ওয়ালেদা সুলতানা" খেতাবে ভূষিত হন।
সুলতান আবদুল হামিদ শাহজাদা থাকা অবস্থায় আরবী, ফরাসী সহ কয়েকটি ভাষা রপ্ত করেন। ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূগোল সহ আরো অসংখ্য জ্ঞান অর্জন করেন। সাম্রাজ্যের শাহজাদা হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরিবারের উপর নির্ভরশীল না হয়ে যুবক অবস্থায় ব্যবসায়-বানিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন এবং স্বনির্ভরণ হন।
১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে পিতা সুলতান আবদুল মাজিদের ইন্তেকালের পর তার চাচা আবদুল আজিজ ৩২ তম সুলতান হিসেবে উসমানী সাম্রাজ্যের ভার গ্রহণ করেন।
সুলতান আবদুল আজিজ প্রথম উসমানী সুলতান, যিনি রাষ্ট্রীয় সফরে মিশর, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স সহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশে সফর করেন। এই সফরে শাহজাদা আবদুল হামিদও তার চাচার সফরসঙ্গী ছিলেন।
মূলত এই সফর থেকেই শাহজাদা আবদুল হামিদ প্রচুর জ্ঞান আহরণ করে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে সম্বৃদ্ধশালী করেন।
১৮৭৬ সালে শত্রুরা সুলতান আবদুল আজিজ (রহ) কে হত্যা করে আবদুল হামিদের বড় ভাই সুলতান পঞ্চম মুরাদকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন।
কিন্তু চাচার শাহাদাতের ফলে পঞ্চম মুরাদ শত্রুদের ভয়ে এতটাই ভীত ছিলেন যে, তিনি তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ।
ফলে তিন মাস পরই অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮৭৬ সালের ৩১শে আগষ্ট দ্বিতীয় আবদুল হামিদ খান ৩৪ তম সুলতান হিসেবে উসমানী সাম্রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
ক্ষমতায় বসেই তিনি এমনভাবে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন যে, ইংরেজ, ফ্রান্স, রাশিয়ার মত প্রভাবশালী সাম্রাজ্যগুলোর ঘুম হারাম করে দেন।
তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সামনে পশ্চিমারা হয় ধরাশায়ী।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ যখন ক্ষমতায় বসেন, সে সময় ইউরোপ থেকে নেয়া এক বিশাল কর্জের বোঝা উসমানী সাম্রাজ্যের মাথায় ছিল। সুলতান সুষ্ঠভাবে সাম্রাজ্য পরিচালনা করে সেই কর্জের প্রায় ৯০% পরিশোধ করতে সক্ষম হন।
এছাড়াও সুলতান উসমানী সাম্রাজ্যের আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সেই লক্ষে সুলতান দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি স্কুল-কলেজ এবং মহিলাদের জন্যও আলাদা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রতিষ্ঠা করেন স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও গবেষনাগার।
নিজস্ব প্রযুক্তিতে অস্ত্র নির্মানের জন্য নির্মান করেন অস্ত্র নির্মানাগার এবং গবেষনাকেন্দ্র।
আরব বিশ্বের মাটির নিচ থেকে মূল্যবান খনিজ তেল উত্তোলন করার জন্য সুলতান নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ার এবং সরঞ্জামাদী তৈরীরও ব্যবস্থা নেন।
সুলতান তার পূরো ৩৩ বছরের সাম্রাজ্য পরিচালনায় মূসলমানদের একতার জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি মুসলমানরা একত্রিত না থাকে, তবে খুব শীঘ্রই তারা অধঃপতনের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হবে। শত্রুরা মুসলামানদের চাকর বানিয়ে রাখবে।
মুসলমানদেরকে একত্রিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। নির্মান করেন হিজাজ রেলওয়ের মত বিশাল প্রকল্প। যা ছিল মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক।
সুলতানের সময়ে ইহুদীরা ফিলিস্তীনের ভূমিতে ইহুদী রাষ্ট্র কায়েম করতে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। তারা জেরুজালেমের একটি অংশ ইহুদীদের নিকট বিক্রির জন্য সুলতানের নিকট প্রস্তাবও রাখে, বিনিময়ে সুলতানকে বিশাল পরিমান অর্থ দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয় তারা, কিন্তু সুলতান তাদের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।
আইন পাশ করেন যে, জেরুজালেমের মাটিতে কেউ জমি ক্রয় বিক্রয় করতে পারবে না।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সাম্রাজ্য পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং মুসলিম বিশ্বকে নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে Payitaht Abdulhamid সিরিয়ালের চেয়ে ভাল মাধ্যম আর একটিও নেই।
এই সিরিজ থেকে আপনারা সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পারবেন।
প্রায় ৩৩ বছর সাম্রাজ্য পরিচালনা করার পর ১৯০৯ সালের ২৭ এপ্রিল ইংরেজ-ইহুদী মদদপুষ্ট তরুন তুর্ক বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ক্ষমতাচ্যুত করার পর তিনি সেলানিকে নির্বাসিত হন।
পরে সেখান থেকে এনে তাকে ইস্তাম্বুলের বেলারবেয় প্রাসাদে গৃহবন্দী রাখা হয়।
ক্ষমতা ছাড়ার দিন তিনি বলেছিলেন, "যদি আমার ক্ষমতা ছাড়ার পর এই সাম্রাজ্যের ১০ বছরও টিকে থাকে, তবে আমি ঐ ১০ বছরকে ১০০ বছর বলে ধরে নিব।"
বস্তত, তার ক্ষমতা ছাড়ার পরপরই উসমানীয়রা বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ১৯১৪ সালে তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও শরীক হয়। ১৯১৮ এর মধ্যে পূরো উসমানীয় সাম্রাজ্যেই ভেঙ্গে খন্ড-বিখন্ড হয়ে যায় এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের বড় অংশই শত্রুদের হাতে চলে যায়।
আল্লাহ তা'আলা হয়ত উসমানী সাম্রাজ্যে এবং মুসলিম বিশ্বের এই হৃদয়বিদারক পতন দেখানোর জন্যই সুলতান আবদুল হামিদকে জীবিত রেখেছিলেন।
অবশেষে ২৮ রবিউল আখির ১৩৩৬ হিজরী মোতাবেক
১০ ফেব্রুয়ারী ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন।
ইস্তাম্বুলে সুলতান গাজী দ্বিতীয় মাহমুদ এর মাজার প্রাঙ্গনে তাকে সমাহিত করা হয়।
আল্লাহ তা'আলার তার উপর অজস্র রহমত বর্ষণ করুন এবং তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন!
এডমিন