17/12/2025
১৮৫২ সালের এক গুমোট দুপুর। কলকাতার গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভের অফিস। বড়সাহেব তখন লাঞ্চ সেরে সবেমাত্র নিজের কাজে মন দিয়েছেন। চারদিকে ফাইলের স্তূপ আর ব্রিটিশ আভিজাত্যের মোড়ক। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা খানখান করে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন এক কৃশকায় বাঙালি যুবক। তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি, যেন তিনি কোনো গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, স্যার আমি পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ আবিষ্কার করে ফেলেছি। সাহেব চমকে উঠলেন। সেদিন সেই বাঙালি যুবক জানতেন না, তাঁর এই আবিষ্কার একদিন বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেবে। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন না, তাঁর কপালে জুটবে কেবল উপেক্ষা আর বঞ্চনার এক অন্ধকার অধ্যায়। ছেলেটির নাম রাধানাথ শিকদার।
জোড়াসাঁকোর শিকদার পাড়ায় জন্ম নেওয়া এই ছেলেটি কোনো সাধারণ কেরানি ছিলেন না। মাত্র তিরিশ টাকা মাইনের বিনিময়ে তিনি ব্রিটিশদের গোলামি করতে আসেননি। তিনি এসেছিলেন নিজের গাণিতিক মেধার জোরে তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে। হিন্দু কলেজের এই ছাত্রটি ছিলেন ডিরোজিওর ভাবাদর্শে বিশ্বাসী এক আপসহীন চরিত্র। নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা তাঁর নখদর্পণে ছিল। কলেজে পড়ার সময়েই তিনি জ্যামিতির জটিল সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছিলেন, যা দেখে সাহেবরাও থমকে যেত।
সেই সময়ে হিমালয়ের বরফে ঢাকা নামহীন শৃঙ্গগুলোকে মাপা হচ্ছিল। সার্ভের খাতায় তাদের নাম ছিল পিক ফিফটিন কিংবা পিক সিক্সটিন। রাধানাথ দিনের পর দিন লগারিদমের জটিল হিসেব কষে চলেছেন। আলোর প্রতিসরণ, বায়ুমণ্ডলের চাপ আর ব্যারোমিটারের তাপমাত্রার ভুল শুধরে তিনি এমন এক ফর্মুলা তৈরি করলেন যা ইউরোপের বিজ্ঞানীরাও জানতেন না। শেষমেশ তাঁর গণনা প্রমাণ করল, পিক ফিফটিনই হলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। উচ্চতা ২৯,০০০ ফুট।
কিন্তু এখানেই শুরু হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের এক নোংরা খেলা। সার্ভেয়র জেনারেল তখন অ্যান্ড্রু ওয়া। তিনি দেখলেন, এক কালা আদমি বা নেটিভ বাঙালির নামে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের পরিচিতি হতে পারে না। তিনি তাঁর পুরনো বস, প্রাক্তন সার্ভেয়র জেনারেল জর্জ এভারেস্টের নামে শৃঙ্গটির নামকরণের প্রস্তাব দিলেন। যে জর্জ এভারেস্ট কোনোদিন ওই পর্বতশৃঙ্গটি দেখেনইনি, তাঁর নামেই অমর হয়ে গেল মাউন্ট এভারেস্ট। আর রাধানাথ? তিনি তলিয়ে গেলেন বিস্মৃতির অতলে। অ্যান্ড্রু ওয়া রাধানাথের নিখুঁত হিসেবেও বিশ্বাস রাখতে পারেননি, তাই ২৯,০০০ ফুটকে রাউন্ড ফিগার মনে করে ইচ্ছেমতো আরও দুই ফুট যোগ করে উচ্চতা ঘোষণা করলেন ২৯,০০২ ফুট। কতটা ধূর্ত হলে ইতিহাসের সঙ্গে এমন জালিয়াতি করা যায়।
রাধানাথ কেবল গণিতবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত বারুদ। ১৮৪৩ সালের ঘটনা। ম্যাজিস্ট্রেট ভ্যান্সিটার্ট তখন সার্ভে বিভাগের কর্মীদের দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত কাজ করাতেন, কথায় কথায় চাবুক মারতেন। একদিন রাধানাথের চোখের সামনে এমন অনাচার দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেননি। সোজা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেই অত্যাচারী সাহেবের বিরুদ্ধে। ইংরেজের আদালতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। ফলাফল হিসেবে তাঁকে ২০০ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি মাথা নত করেননি। তিনি জানতেন, গোমাংস ভক্ষণকারী ডিরোজিয়ানরা কাউকে ভয় পায় না।
সারাজীবন তিনি কেবল কাজ করে গেছেন। বিবাহ করেননি, সংসার পাতেননি। তাঁর সংসার ছিল ওই রাশি রাশি সংখ্যা আর নক্ষত্রের জগত। জার্মানির ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি তাঁকে সম্মান জানালেও, নিজের দেশে তিনি ছিলেন এক ব্রাত্য নায়ক। ১৮৭০ সালে চন্দননগরের এক বাগানবাড়িতে নীরবে নিভৃতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই অভিমানী বিজ্ঞানী।
আজ যখন আমরা মাউন্ট এভারেস্টের দিকে তাকাই, আমরা কেবল এক শ্বেতাঙ্গ সাহেবের নাম দেখি। কিন্তু সেই বরফের স্তরের নিচে চাপা পড়ে আছে এক বাঙালির ঘাম, রক্ত আর মেধার গল্প। ইতিহাস তাঁকে স্থান দেয়নি, কিন্তু সত্য কোনোদিন মুছে যায় না। পিক ফিফটিন আজও দাঁড়িয়ে আছে রাধানাথের নীরব সাক্ষী হয়ে।
SOURCES:
1. Roar Media - "মাউন্ট এভারেস্ট ও একজন উপেক্ষিত রাধানাথ শিকদার"
2. Wikipedia - "Radhanath Sikdar"
3. The Telegraph - "Radhanath Sikdar: A past we must preserve"
4. Anandabazar Patrika - "প্রথম স্বদেশি বিজ্ঞানী"
5. India Today - "Everest didn’t find Everest: An Indian did, and history forgot him"
পেজটি ভালো লাগলে লাইক ও ফলো করে আমাদের উৎসাহ জোগাবেন, আর শেয়ার করে অন্যদের দেখার সুযোগ করে দেবেন।
বিধিকরণ সতর্কতা:
©Bangla Tweet — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এই লেখার কোনো অংশ অনুমতি ছাড়া কপি বা পুনঃপ্রকাশ করা নিষিদ্ধ। ব্যবহার করতে চাইলে পেজের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে—অন্যথায় তা কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে।