20/04/2026
জনান্তিকে
বাঙালি হিসেবে আমার অবলম্বন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতা।
শৈশবে বিদ্যালয়ে পা রাখার আগে রবীন্দ্রনাথের শিশু ভোলানাথ মুখস্থ বলতে শিখেছিলাম।
বহুকাল হয়, খেলা-ভোলার সেইসব দিন ফেলে এসেছি। তবু মনে গেঁথে আছে, "তিনটে শালিখ ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে" অথবা, "শীতের বেলায় দুই পহরে/দূরে কাদের ছাদের 'পরে/ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগনি রঙের শাড়ি"।
জীবনের পথে চলতে চলতে কবে কখন জীবনানন্দ দাশের কবিতা ঘিরে ফেললো আমার "বোধ"- জীবনানন্দ পাঠ বুঝি বোধগম্য হয় না এক জন্মে, বরং আজন্ম এক তৃষ্ণা জেগে রয় আত্ম অন্বেষণের।
হয়তো আত্ম অন্বেষণের দুর্নিবার টানেই, পুরোনো জানালা-দরজা, নোনা ধরা দেয়ালের চরিত্রগুলো জড়ো করে, নিয়ত খুঁজে ফিরতে থাকি জীবনের গল্প। গল্পগুলো জনসমীপেই থাকে, তবু কোথায় যেন আড়ালে। দৈনন্দিন চলাচলে কারও চোখে পড়ে বা পড়ে না। তবু ওরা জীবনগল্পে বোঝাই গাট্টিবোঁচকা বয়ে নিয়ে, রোদ-জল-দাবদাহে স্নাত হয়ে টিকে থাকে। হেমন্তের বিষণ্ণতা নিয়ে, পৌষের হিম কিংবা চৈত্রের হাহাকার বুকে নিয়ে যাপন করে অগুনতি রাত্রিদিন-"জনান্তিকে" রয়ে যাওয়া সময়ের এইসব "নির্জন স্বাক্ষর"। পুরাতন সময়ের এইসব চেনা-অচেনা স্মৃতিচিত্রের ভিড়ে, কড়া নেড়ে চলি অম্বিকা বসু লেনের ধূসর দরজায়, আবার স্তব্ধ দাঁড়িয়ে শুনি, সেই কবেকার স্টেশনের জানালা থেকে ভেসে আসা- "তুমি নাই বনলতা সেন"। বৈরী সময়ের আত্মদহন থেকে নিদারুণ মনোবল খুঁজে পাই "সূর্যতামসী"র কাছে।
মা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এবং একাত্তরের সকল জননীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য একটি ছোট্ট দরজার কাজ খালিশপুর '৭১, আগলে রাখি সারাবছর। অবলম্বন আর জীবনবোধ ছাপিয়ে আমার সকল কর্মের আশ্রয় মা প্রিয়ভাষিণী। তাঁর চলে যাওয়া পথের পানে চেয়ে থাকতে থাকতেই একদিন হঠাৎ নিজের মতো চলতে শুরু করেছিলাম আনমনে। বুক খাঁ খাঁ করা গ্রীষ্মের দুপুরে ভীষণ একলা "এই বিজনতা"য় খুঁজে পাই, জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী প্রিয়ভাষিণীর শান্ত মুখের অস্পষ্ট সাদাকালো ছবিটা।
"কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ;
বহুদিন থেকে শান্তি নেই।
নীড় নেই
পাখিরো মতন কোনো হৃদয়ের তরে।
পাখি নেই।"
তারপরও কত শতাব্দীর ঘোরে বিভোর হয়ে বারবার থমকে দাঁড়াই সেইসব পুরোনো সময়ের কাছে!
ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী
২১শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
(বসন্তকাল)