15/08/2026
~ চন্দ্রকেতুগড়~
পশ্চিম বঙ্গের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর-নগরী সভ্যতা
----------------------------------------------------
কলকাতা থেকে ৩৫ কিমি, বেড়াচাঁপায়। ২৫০০ বছরের বেশী পুরনো প্রাচীন বন্দর শহর গঙ্গারিডি সভ্যতার রাজধানী মনে করা হয়। মৌর্য, শুঙ্গ যুগের মুদ্রা, পোড়ামাটির মূর্তি প্রচুর পাওয়া গেছে। পশ্চিম বঙ্গের সবচেয়ে বড় প্রত্নস্থল।
ছবিতে যেমন দেখছেন, একদিকে ইটের গাঁথা দুর্গ-নগরীর ধ্বংসাবশেষ, আর অন্যদিকে সেই বিখ্যাত পোড়ামাটির ফলক, মাটির পাত্র, পুঁতি আর মুদ্রা — যা ২৫০০ বছরের ইতিহাস বহন করছে।
তথ্য এক নজরে
--------------------
অবস্থান: কলকাতা থেকে ৩৫ কিমি উত্তর-পূর্বে, বেড়াচাঁপার কাছে। একসময় বিদ্যাধরী নদীর তীরে ছিল, এখন দেবালয়, হাদিপুর, শানপুকুর গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
বয়স: প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একটানা ১২০০ বছর মানুষ বসবাস করেছে। মৌর্য (৩০০ খ্রিঃপূঃ) থেকে গুপ্ত যুগ পর্যন্ত।
কি পাওয়া গেছে:
----------------
প্রাচীর ঘেরা দুর্গ-শহর, রাস্তা, জলনিকাশি ব্যবস্থা
বিখ্যাত পোড়ামাটির ফলক - রাজা-রানী, দেবদেবী, সমুদ্রযাত্রার দৃশ্য
রোমান, গ্রীক মুদ্রা, সোনা-রুপার অলংকার - প্রমাণ করে ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্য হতো
খনা-মিহিরের ঢিবি - জ্যোতির্বিদ খনা ও মিহিরের বাড়ি বলে কথিত।
ইতিহাসে গুরুত্ব: গ্রীক লেখকরা যে গঙ্গারিডি সাম্রাজ্যের কথা লিখেছেন, যারা আলেকজান্ডারকেও ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন তার রাজধানী ছিল এই চন্দ্রকেতুগড়ই। টলেমির মানচিত্রেও এর উল্লেখ আছে।
এখন কিভাবে দেখবেন: বেড়াচাঁপায় দিলীপ মাইতির ব্যক্তিগত মিউজিয়াম আছে, আর কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়াম ও ভারতীয় জাদুঘরে আসল জিনিসগুলো রাখা আছে।
চন্দ্রকেতুগড় নিয়ে নতুন যা জানা গেছে, সেটা আরও চমকপ্রদ —
১. আরও পুরনো হচ্ছে বয়স
আগে ভাবা হতো খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দ থেকে শুরু। কিন্তু ASI-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকে ১২শ শতক পর্যন্ত — প্রায় ১৬০০ বছর ধরে একটানা শহর ছিল এখানে। দমদমের ক্লাইভ হাউসের কাছে নতুন খননে যে মাটির স্তর পাওয়া গেছে, তার সাথে চন্দ্রকেতুগড়ের মিল হুবহু, তাতে প্রমাণ হচ্ছে কলকাতারও ইতিহাস ২২০০ বছর পুরনো হতে পারে।
২. সমুদ্র বাণিজ্যের প্রমাণ
পোড়ামাটির সিলে সমুদ্রগামী জাহাজের ছবি পাওয়া গেছে, জাহাজে ধানের বস্তা, পাশে শঙ্খের চিহ্ন। মানে এখান থেকে চাল রপ্তানি হতো।
রোমান অ্যাম্ফোরা (মদের জার), খরোষ্ঠী লিপি, এমনকি গ্রীক মৃৎপাত্রও মিলেছে। পূর্ব ভারতে এত বিদেশি জিনিস আর কোথাও একসাথে পাওয়া যায়নি।
৩. কেন ধ্বংস হলো?
খননে বন্যার পলির মোটা স্তর পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, বিদ্যাধরী নদীতে বারবার বন্যা আর নদীর গতিপথ বদলে যাওয়াই এই সমৃদ্ধ বন্দর শহরকে শেষ করে দেয়।
৪. এখনও যা লুকিয়ে আছে
চন্দ্রকেতুগড় বাংলার একমাত্র জায়গা যেখানে সবচেয়ে বেশি পোড়ামাটির মূর্তি পাওয়া গেছে — এখনও পর্যন্ত হাজার হাজার।
অনেক জিনিস ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেছে, বিদেশের মিউজিয়ামে আছে। বেড়াচাঁপায় দিলীপ মাইতির বাড়িতে এখনও গ্রামবাসীরা লাঙল দিতে গিয়ে পাওয়া মূর্তি এনে জমা দেন।
খনা-মিহিরের ঢিবিতে যে মন্দিরটা আছে, সেটা শুধু মন্দির নয়, তার নিচে আরও বড় প্রাসাদ-নগরী আছে বলে ASI মনে করছে।
মজার কথা — পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে যেমন মানুষ মাটির বাড়িতে থাকত, চন্দ্রকেতুগড়ে ততদিনে পাকা ইটের দুর্গ, পাকা রাস্তা, আর শিল্পীরা অসম্ভব সুন্দর পোড়ামাটির গল্প বলা ফলক বানাত। মানে ১০০০ বছরে বাংলার সভ্যতা কতটা এগিয়েছিল, এই দুটো জায়গা পাশাপাশি দেখলেই বোঝা যায়।
আর একটা জিনিস যেটা অনেকেই জানে না —
চন্দ্রকেতুগড়ের নামটা কোথা থেকে এলো?
স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই দুর্গের রাজা ছিলেন চন্দ্রকেতু — তার নামেই চন্দ্রকেতুগড়। আবার কেউ বলেন, গুপ্ত রাজা চন্দ্রগুপ্তের নামে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, খননে যে রাজপ্রাসাদ পাওয়া গেছে, তার সাথে মহাভারতের রাজা চন্দ্রকেতুর গল্পও জুড়ে যায় — অনেকটা আপনার পাণ্ডুরাজার ঢিবির মতোই, ইতিহাস আর পুরাণ মিশে আছে।
আরও ৩টে চমক:
১. খনার বচন এখান থেকেই? যে খনা-মিহিরের ঢিবির কথা বললাম, লোকমতে সেই খনাই হলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও "খনার বচন"-এর খনা। তাঁর শ্বশুর মিহির ছিলেন বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের একজন। যদিও এটা নিয়ে বিতর্ক আছে।
২. সবচেয়ে বড় পোড়ামাটির ভাণ্ডার: পুরো পূর্ব ভারতে এক জায়গায় এত পোড়ামাটির কাজ আর কোথাও পাওয়া যায়নি। দেবী, যুদ্ধ, প্রেম, জাহাজ, এমনকি বিদেশি মানুষের মুখ — সব মাটিতে ফুটিয়ে তুলত শিল্পীরা।
৩. এখনও মাটির নিচেই ৯০% শহর: ASI মাত্র ৫-৬টা ঢিবি খুঁড়েছে। বেড়াচাঁপা, হাদিপুর, দেবালয় জুড়ে প্রায় ৪ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে শহরটি ছিল — যার বেশিরভাগই এখনও ধানক্ষেতের নিচে। বর্ষাকালে চাষিরা লাঙল দিতে গিয়ে এখনও মুদ্রা, পুঁতি পান।
আপনি যদি একদিন যেতে চান, সকালে বেড়াচাঁপা পৌঁছে প্রথমে দিলীপ বাবুর মিউজিয়াম, তারপর খনা-মিহিরের ঢিবি আর দেবালয়ের দুর্গটা দেখে নেবেন। কলকাতা থেকে মাত্র ২ ঘণ্টার রাস্তা।
লেখার কপিরাইট@ #পুরানো_ভারতের_চালচিত্র -
ওয়ার্নিংঃ- পোস্ট শেয়ার করা যাবে। লেখা কোন ভাবেই কপি পেস্ট করা যাবেনা।