23/07/2026
কৃষ্ণপুর: নামের আড়ালে ইতিহাসের এক নীরব অধ্যায়
-----------------------------------------------------------------------------
পানিহাটি পৌরসভার অন্তর্গত নাটাগড় অঞ্চলের একটি অংশের নাম কৃষ্ণপুর। আজও এই এলাকার পরিচয় বহন করে কৃষ্ণপুর রোড। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করলেও, "কৃষ্ণপুর" নামের পেছনে যে বহু শতাব্দীর ইতিহাস, তা অনেকেরই অজানা।
✍️ ঐতিহ্যের পানিহাটী
একসময় কৃষ্ণপুর ছিল নদীয়া রাজপরিবারের অধীনস্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌজা। প্রায় ১৬৬.০১ একর বিস্তৃত এই মৌজাটি কৃষ্ণনগরের মহারাজার জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে ছিল রাজাদের কাছারি ঘর, আর ছিল তাঁদের পরম আরাধ্য কুলদেবতা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ। এই কারণেই কৃষ্ণপুর শুধুমাত্র প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বেও ছিল সমান মর্যাদাসম্পন্ন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ শুরু হলে সমগ্র জনপদে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সে সময় বহু রাজা, জমিদার ও সম্ভ্রান্ত পরিবার তাঁদের পারিবারিক দেবদেবীর বিগ্রহ রক্ষা করার জন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতেন এবং এলাকায় প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, নদীয়া রাজপরিবারের সম্মতিতে কৃষ্ণপুরেও স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে একটি গড় বা প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাজকাছারি, রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এবং এলাকার সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা।
কৃষ্ণপুর নামের উৎপত্তি সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর আমন্ত্রণে পণ্ডিত রামজীবন বিদ্যাবাচস্পতি মহাশয়কে এই অঞ্চলে এনে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। তাঁর সংসার নির্বাহের জন্য মহারাজা প্রায় ৩০০ বিঘা জমি দান করেন এবং কৃষ্ণপুরে প্রতিষ্ঠিত রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের সেবাপূজার দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পণ করেন।
ক্রমে এই অঞ্চলে দানভোগী ব্রাহ্মণদের বসতি গড়ে ওঠে। রাধাকৃষ্ণের মন্দিরকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন বিকশিত হয়। এই কারণেই এলাকাটি পরিচিতি লাভ করে "কৃষ্ণপুর" নামে। বিদ্যাবাচস্পতি পরিবারের উত্তরসূরিদের প্রকাশিত একটি প্রাচীন গ্রন্থেও এই ঐতিহ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে কৃষ্ণপুর হয়তো শুধুই একটি এলাকার নাম। কিন্তু এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদীয়া রাজপরিবারের স্মৃতি, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা, রাধাকৃষ্ণের আরাধনা, মারাঠা আক্রমণের অস্থির সময়ের ইতিহাস এবং বাংলার প্রাচীন জনপদের এক গৌরবময় অধ্যায়।
তাই কৃষ্ণপুর কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়—এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভক্তি এবং বাংলার অতীতের এক মূল্যবান স্মারক।
আজকের দিনে কৃষ্ণপুর নামটি সকলের কাছেই পরিচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এলাকাবাসীর অনেকেই জানেন না এই নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের কথা। প্রতিদিন কৃষ্ণপুর রোড দিয়ে অসংখ্য মানুষের যাতায়াত হলেও, এই নাম যে নদীয়া রাজপরিবার, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এবং এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে চলেছে—সেই ইতিহাস ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব। কারণ একটি এলাকার নাম শুধু একটি পরিচয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের স্মৃতি।
তথ্যসূত্র :
১।কালের কড়চায় বৃহত্তর পানিহাটি — সাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়
২, পানিহাটি পরিক্রমা — শিক্ষক কৃশানু ভট্টাচার্য