23/08/2026
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য - এই ছয়টি রিপু, মানবজীবনের কণ্টকও বলা চলে। ষড়রিপু মধ্যে একটিও যদি ব্যক্তিমনে জায়গা পেয়ে যায় তাহলে আর রক্ষে নেই। কিন্তু মনে যদি একইসাথে ছয়টিই জায়গা করে নেয় তখন?
বিশ্ববিখ্যাত ছবি আঁকিয়ে প্রতিবারই নন্দিত হয়েছেন "স্যার থমাস"। কিন্তু এতদূর পথ পাড়ি দেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। কিছু পাওয়ার জন্য কিছু ত্যাগ করতে হয়। এতবছর পর এসে স্যার থমাসের কেন জানি মনে হতে থাকে "কিছু" পাওয়ার জন্য তিনি আসলে "অনেক বেশিই" ত্যাগ করে ফেলেছেন! মিশর থেকে আসা বাক্স দুটো বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকে ভুল করে ফেলেছেন তিনি। অনেক বড় ভুল...
নীল বেশ কয়েকদিন থেকেই ঘুরছে পুরনো রাজবাড়ির আশেপাশে। বুঝে উঠতে পারছে না বিশ্বখ্যাত একজন আর্টিস্ট কেন আছেন পুরনো একটা রাজবাড়িতে তাও বাংলাদেশে। কিন্তু মন বলছে বছর ধরে যে প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজছে সে তা শুধুমাত্র স্যার থমাসই দিতে পারবেন। রহমত ভয়ে থাকে স্যার থমাসের জন্য আর কত পাপের বোঝা তাকে বইতে হবে। আকাশে উড়তে দেখা যাচ্ছে এক আজব প্রাণী, যার উপরে বসে আছে নয় ফুট লম্বা এক ব্যক্তি! ঈসমাইল সাহেবের বন্ধ ঘরে কে যেন লুকিয়ে আছে! মিশরের দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় স্যার থমাসকে। রাতের আঁধারে বিদঘুটে এক জীবের আগমন ঘটে পুরনো রাজবাড়িতে! কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যে ছবিগুলোর দরুন স্যার থমাস পেয়েছেন বিশ্বখ্যাতি তা ওনার আঁকানো নয়... তাহলে কে আঁকিয়ে চলেছে একের পর এক চিত্রকর্ম?
মিথ, মিস্ট্রি, এডভেঞ্চার, ক্রাইম, থ্রিলের মিশেল ঘটেছে "শিল্পী আমি, আঁকে সে"। কথায় আছে "লোভে পাপ, পাপে মৃ`ত্যু"; লেখক আসলে এমনটাই দেখানোর চেষ্টা করেছেন বইয়ে তবে নিজস্ব আঙ্গিকে। কোনো জিনিসের প্রতি ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক, তা পাওয়ার জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়াও চলে তবে নিজেকে বদলিয়ে অন্য কেউ- এ পরিবর্তন করলে? আর সেই অন্য কেউ যদি হয় মা`রাত্মক ভয়াবহ? একজনের সুখের জন্য যদি অনেকের দুর্ভোগ হয়, তাহলে কি স্বাভাবিক বলা চলে? এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে বইয়ে। যদিও বেশ কিছু চরিত্রের উল্লেখ রয়েছে, স্যার থমাস- ই মূল চরিত্র। গল্পের শুরু থমাসের "স্যার থমাস" হয়ে উঠা দিয়ে আর শেষ... উহ, এটা বলবো না স্পয়লার হয়ে যায়। পাঠক নাহয় পড়েই জানুক।
চরিত্রগুলোকে লেখক স্বতন্ত্র হিসেবেই দেখিয়েছেন। কেউ ফোকাস পেয়েছে তো কেউ পায়নি। তবে সকলের জীবনেই এমন কিছু ঘটনা আছে যার জন্য জড়িয়ে পড়েছে একে অপরের সাথে। অবশ্যই কেন্দ্রবিন্দু স্যার থমাস। রহমতের চরিত্রটা আমার কাছে বেশ জটিল মনে হয়েছে। যুগ চরিত্রটাও ভালো লেগেছে তবে ধোঁয়াশায় রাখা হয়েছে। বইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মাহতাব হলেও কিছুটা অসম্পূর্ণ লেগেছে। শুরুটা গোছানো হলেও শেষটা কিছুটা খাপছাড়া। তবে ইতি টানা হয়েছে পরিপূর্ণভাবেই।
কিছু খটকা আছে আবার কিছু অসংগতিও চোখে পড়েছে। থমাস-শেখ সাহেবের কথোপকথন অনেকটা অনুবাদ ধাঁচের। শুরুতে থমাস একবার বলেছে রহমতের মা বাসায় কিন্তু রহমতের মা তো বহু বছর আগেই মা`রা গেছে! অথোসিস রায়হান আর যুগের যোগাযোগ আগে থেকে জানলেও লুকিয়ে রেখেছিল কেন? এটা খোলসা করার দরকার ছিল। রিচার্ডের দেওয়া চিঠিটা ঠিক চিঠি মনে হয়নি যেন ফোনালাপ। "তো রাখলাম চিঠি?"- চিঠিতে এমন লাইন!
প্রুফ রিড আর সম্পাদনায় কিছুটা ঘাটতি আছে। বিপরীত শব্দ, অসম্পূর্ণ বাক্য, বানান ভুল আছে কিছু।
৭৬ পৃষ্ঠা- অস্বাভাবিক(স্বাভাবিক) আছেন কী করে?
১৬২ পৃষ্ঠা- পুরা বাড়ি এহন স্বাভাবিক হয়ে(গেছে)।
১৬৫ পৃষ্ঠা- এখন ওনাকে মারা সম্ভব আমার মনে(হয়)।
২১৪ পৃষ্ঠা- মূলত দেখতে যাওয়ার মতো সাহসটুকু পাচ্ছে (না)।
২১৬ পৃষ্ঠা- আর মনে মনে সেদিনের ঘটনার কামনা(করলো)।
এমন আরও আছে।
প্রচ্ছদ ও নামলিপি দারুণ হয়েছে। বিশেষ করে প্রচ্ছদটা বইয়ের ওভারঅল প্লট তুলে ধরেছে। প্রথম বই হিসেবে লেখক পাঠকদের নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রশংসার দাবিদার তবে এখনও কিছুটা উন্নতির প্রয়োজন আছে বলেই মনে হয়েছে। ইউনিক প্লট, ভালো লেগেছে। পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় থাকবো অতি অবশ্যই যুগের অতীতের জন্য। তবে প্রতিটি বই-ই কিন্তু স্টান্ড অ্যালোন।
বই: শিল্পী আমি, আঁকে সে
লেখক: শাহরিয়ার হাসান
জনরা: মিথলজিক্যাল থ্রিলার
প্রচ্ছদ: সজল চৌধুরী
প্রকাশনী: বর্ণলিপি
প্রথম প্রকাশ: ১০ জুলাই, ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২২০
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০/-