06/05/2026
এক 'বুনো', আশীর্বাদের মুদ্রা ও আমাদের শহীদ মিনার
যাঁকে বলা যায় অবাধ্য ও অদম্য; সবাই ডাকত 'বুনো' বলে। তিনি বাংলার আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ—নভেরা আহমেদ। সমাজের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাবার এক সহকর্মীর ছেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছিল। কিন্তু দৃঢ়চেতা কিশোরী নভেরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘না, আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি ভাস্কর হব, ভাস্কর্য তৈরি করব।’ পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজবাস্তবতায় একজন মুসলিম নারীর জন্য সেটি ছিল প্রায় অকল্পনীয় এক চিন্তা।
সময়টি ছিল ১৯৫০ বা ১৯৫১ সাল, বিয়ের সে ধাক্কা কাটিয়েছেন। বয়স মাত্র তেরো। বাবা আইন পড়ার উদ্দেশ্যে লন্ডনে পাঠালেন কিন্তু তিনি গিয়ে ভর্তি হলেন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টসে। ক্ষুব্ধ বাবা অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দিলেও অদম্য নভেরা দমে যাননি। স্বীয় প্রচেষ্টায় লন্ডনের পাঠ চুকিয়ে তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স ও ভিয়েনায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর যখন ঢাকায় ফিরে এলেন, তখন দেখলেন এক বিশাল শূন্যতা। সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁর বাবা পরামর্শ দিলেন, ‘তুমি সিমেন্ট দিয়েই কাজ শুরু করো না কেন?’
নভেরা তা-ই করলেন। এরপরের ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় বদলে দিল..
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে সরকার একটি মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। দেশে তখন একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভাস্কর ছিলেন নভেরা আহমেদ। সরকারের অনুরোধে তিনি কাজ শুরু করেন এবং মিনারটির মূল নকশা তৈরি করেন। সহকারী হিসেবে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন চিত্রশিল্পী হামিদুর রাহমান।
নভেরার ভাষ্যমতে, শহীদ মিনারের মূল অনুপ্রেরণা ছিল 'আশীর্বাদের মুদ্রা'। পাঁচটি স্তম্ভ মূলত জনতার প্রতি আশীর্বাদের পাঁচটি আঙুলের প্রতীক। প্রচলিতভাবে একে 'মা ও সন্তান' বলা হলেও প্রকৃত নকশাটি ছিল দার্শনিক ও বিমূর্ত। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে নভেরাকে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই লাহোরে চলে যেতে হয়। পরবর্তীতে হামিদুর রাহমান প্রকল্পটি সম্পন্ন করেন। ফলে অনেকের ধারণা এটি কেবল তাঁরই কাজ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদি স্রষ্টা ও মূল ভাবনার নেপথ্যে ছিলেন নভেরা আহমেদ।
বিয়ে কিংবা আইন নিয়ে পড়লে গল্পটা ভিন্ন হতে পারত, বদলে যেত প্রেক্ষাপটও। কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তি তাঁকে করে তুলেছে পূর্ববঙ্গের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ। নভেরা কেবল আধুনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন 'প্রিমিটিভ' বা আদিম রূপের অনুসারী। ভারতে রামকিঙ্কর বেইজ যেমন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নভেরা আহমেদও তেমন; বাংলায় তাঁর কোনো পূর্বজ নেই।
তথ্যসূত্র:
১. 'নভেরার অজানা জীবন', প্রথম আলো, ৫ এপ্রিল ২০২৫।
(২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে নভেরা সম্পর্কে তাঁর স্বামী গ্রেগোয়ার দ্য ফ্রঁস-এর দেওয়া বক্তব্য; অনুবাদ: জাভেদ হুসেন)।
২. 'বাংলার আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদ', ডেইলি স্টার বাংলা, ৬ মে ২০২৪।
#নভেরা_আহমেদ #শহীদ_মিনার #ভাস্কর #আধুনিক_ভাস্কর্য #আশীর্বাদের_মুদ্রা #বাংলার_নারী #ইতিহাস #ভাষা_আন্দোলন ্মৃতি #বুনো #অদম্য