07/11/2025
১৯০১ সালের ঢাকার রাস্তায় গাড়ির উপস্থিতি ছিল এক বিরল ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই সময়কার ঢাকা আজকের মতো ব্যস্ত, আধুনিক কিংবা যানজটপূর্ণ শহর ছিল না। তখন এটি ছিল এক শান্ত, জনবিরল, মূলত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে একটি প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক নগরী।
১৯০১ সালে ঢাকা ছিল প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ মানুষের একটি ছোট শহর। ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীনে এটি ছিল পূর্ববঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা সদর। শহরের মূল এলাকা ছিল সদরঘাট, নবাবপুর, ইসলামপুর, লালবাগ, আরমানিটোলা, ওয়ারী, ওল্ড ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চল।
রাস্তা ছিল সরু, কাঁচা বা আধাপাকা, অনেক জায়গায় ঘোড়ার গাড়ি বা পালকিতে চলাচলের উপযোগী। পিচঢালা রাস্তা ছিল হাতে গোনা কয়েকটি — বিশেষ করে নবাব পরিবারের প্রভাবাধীন অঞ্চল ও ব্রিটিশ অফিসারদের বসত এলাকায়।ঐ সময় ‘গাড়ি’ বলতে বোঝানো হতো মূলত ঘোড়ায় টানা গাড়ি (Horse Carriage)। তবে ১৮৯০ দশকের শেষ দিকে ব্রিটিশ অফিসার ও ঢাকার নবাব পরিবারের উদ্যোগে ইউরোপ থেকে আনা মোটরগাড়ি (Motor Car) প্রথম ঢাকায় আসে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ঢাকায় প্রথম মোটরগাড়ি আসে নবাব সলিমুল্লাহর আমলে। নবাব পরিবার ব্রিটিশদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন, ফলে তারা ইউরোপীয় বিলাসিতা দ্রুত গ্রহণ করতেন।
প্রথম দিকের মোটরগাড়িগুলো ছিল বড় আকারের, কালো বা গাঢ় রঙের, পেট্রোল চালিত, এবং ম্যানুয়াল ইঞ্জিনে চলত। এসব গাড়ি চালাতেন বিদেশি বা বিশেষ প্রশিক্ষিত চালক।
১৯০১ সালের ঢাকায় গাড়ি দেখা যেত খুব কম — সাধারণত নবাব পরিবার, ধনাঢ্য বণিক, কিংবা কোনো ব্রিটিশ অফিসারের বাসভবনের সামনে। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চললে লোকজন বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখত। বলা হয়,
“গাড়ির শব্দে তখন পথের মানুষ থেমে যেত, শিশুরা ছুটে আসত দেখতে— এমন ‘লৌহ দানব’ কীভাবে নিজে নিজে চলে!”
বেশিরভাগ মানুষ চলাচল করত পালকি, ঘোড়ার গাড়ি, ঠেলা গাড়ি বা নৌকায়। কারণ ঢাকার চারপাশে তখন অসংখ্য খাল ও নদী ছিল। রাস্তায় যানবাহনের তুলনায় নৌযানই ছিল অধিক জনপ্রিয়।
নবাববাড়ি থেকে সদরঘাট পর্যন্ত রাস্তা
আর্মেনিয়ান স্ট্রিট ও বিক্রমপুর হাউসের এলাকা
ওয়ারী ও গ্যান্ডারিয়া অঞ্চলের কিছু ইউরোপীয় বসতি
পরে মিটফোর্ড রোড (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এলাকা)
ঢাকায় মোটরগাড়ির আগমন মূলত আধুনিকতার সূচনা নির্দেশ করেছিল। এটি ছিল এমন এক সময় যখন শহরটি ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী বণিক নগরী থেকে আধুনিক প্রশাসনিক শহরে রূপ নিচ্ছিল।
১৯০১ সালে মোটরগাড়ি ছিল অভিজাতদের প্রতীক — সাধারণ মানুষের কাছে অদ্ভুত, অচেনা, বিলাসী এক বস্তু। পরে ১৯২০–৩০ দশকে গাড়ির সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, যখন ঢাকায় নতুন রাস্তা, অফিস, ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
(ছবিতে ১৯০১ সালের ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চলাচলের ছবি৷)