24/09/2026
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর–ফরাশগঞ্জ এলাকার ধোলাইখালের ওপর একসময় দাঁড়িয়ে ছিল ঐতিহাসিক লোহারপুল—পুরান ঢাকার যোগাযোগ, নগরজীবন ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজন দেখা দিলে তৎকালীন ব্রিটিশ কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টারের উদ্যোগে ধোলাইখালের ওপর একটি ঝুলন্ত লোহার সেতু নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে এর নির্মাণকাল ১৮৩১ বা ১৮৩২ সাল হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। সেতুটি ছিল এক স্প্যানের ঝুলন্ত সেতু এবং এর লোহার কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল।
সেতুটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার সঙ্গে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করা। বিশেষ করে সূত্রাপুর, ফরাশগঞ্জ, গেন্ডারিয়া ও নারায়ণগঞ্জমুখী যাতায়াতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ধোলাইখাল তখন শুধু একটি খাল ছিল না—নৌযান, পণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক ছিল।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লোহারপুল পুরান ঢাকার মানুষের কাছে একটি পরিচিত স্থান হয়ে ওঠে। খালের ওপর দিয়ে মানুষ ও যানবাহন চলাচল করত, আর আশপাশের এলাকা ছিল ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত। ধোলাইখালের পানিতে একসময় নৌকা চলত, এমনকি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও এখানে নৌকাবাইচ, সাঁতার ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের স্মৃতি পাওয়া যায়।
আশির দশকের পুরান ঢাকার মানুষের কাছে ‘লোহারপুল’ নামটি তাই শুধু একটি সেতুর নাম ছিল না; এটি ছিল একটি সময়ের স্মৃতি। তখনও পুরান ঢাকার অলিগলি, ব্যস্ত রাস্তা, রিকশা, দোকানপাট এবং ধোলাইখালের আশপাশের জীবন মিলিয়ে জায়গাটি ছিল অত্যন্ত পরিচিত।
পরবর্তীতে ধোলাইখালের বড় অংশ ভরাট ও বক্স কালভার্টে রূপান্তরিত হতে থাকে। খালের ওপরের পুরোনো সেতুটিও আর টিকে থাকেনি। আজ সেখানে সেই ঐতিহাসিক ঝুলন্ত লোহার সেতু নেই; রাস্তা ও আধুনিক নগর কাঠামোর নিচে হারিয়ে গেছে তার অস্তিত্ব। কিন্তু ‘লোহারপুল’ নামটি এখনও পুরান ঢাকার মানুষের মুখে ও এলাকার পরিচয়ে বেঁচে আছে।
একসময় যে সেতুর ওপর দিয়ে মানুষ চলত, নিচ দিয়ে নৌকা চলত এবং চারপাশে ছিল পুরান ঢাকার প্রাণচাঞ্চল্য—আজ সেই দৃশ্য কেবল পুরোনো ছবি, নথি ও মানুষের স্মৃতিতে ফিরে আসে।
লোহারপুল তাই শুধু একটি পুরোনো সেতুর গল্প নয়; এটি পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া জলপথ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন।