03/04/2026
#গল্পের_নাম: "মোহনা"
#লেখক_"অচেনা গল্পকার"
আজ ৪ বছর পর দেশে ফিরছি। সব কিছু অচেনা হয়ে গেছে এই ঢাকা শহর যেন অস্বচ্ছ কোলাহলে আচ্ছাদিত হয়ে গিয়েছে।
হঠাৎ এক মিষ্টি কন্ঠস্বর
- যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা অনুরোধ করব
- জ্বি বলেন
- উইনডো সিট টা কি আমাকে দেয়া যাবে? আসলে আমি অনেক চেষ্টা করেও টিকেট পাইনি জানালার পাশে। প্লীজ.....
এত মায়াবি চাহনি তে সে বলল আমি তার কথা ফেলতে পারলাম না
-জ্বি বসেন
-অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
-ঠিক আছে।
আমি তার সিটে বসলাম, পাশাপাশি সিট।
একটু পরেই ট্রেন ছাড়লো। কিছুক্ষণ ট্রেন চলার পর হঠাৎ বাহিরে চোখ গেলো। পূর্ণিমা রাত। চাঁদের আলোয় আলোকিত পুরো আকাশ। মিটিমিটি তারা জ্বলছে। চলে গেলাম দরজার সামনে। এই রাতটা খুব পরিচিত আমার। নাহ আমাদের। এখনো সেই কথাটা কানে আসে- এইটা তুই, তোর একপাশে আমি আরেকপাশে অর্ক। এই তিনটা তারার মতো আমরাও একসাথে থাকবো। কিরে কিছু বল, তোরা না আমার কোনো কথাই শুনিস না।
একটু মুচকি হেসে মনে মনে বললাম আবার যদি সবটা আগের মতো হতো।
এবার একটু সিটে বসা যাক।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর মেয়েটি বলে উঠলো
- পূর্ণিমা রাত খুবই পছন্দ?
- হ্যা। অনেক স্মৃতি জড়িত
- তাই?
- জ্বি
- আমার ও খুব ভালো লাগে।
- ও আচ্ছা
- ইমমম আচ্ছা স্মৃতি গুলো কি? বলা যাবে? কিছু মনে করবেন না আসলে এতো লম্বা সময় চুপ করে বসে তো থাকা যায় না তাই আপনার গল্প শুনেই সময় কাটাতে ইচ্ছে হলো। তোহ বলবেন কি?
- আচ্ছা ঠিক আছে বলবো।
হাতের বইটা রেখে সে বলল হ্যা বলেন
এইতো তিন বন্ধু প্রায়ই রাতে আড্ডা দিতাম। আসলে বাসা কাছেই ছিল।
-ও। কিন্তু গল্প কি এভাবে বললে হয়?
-তাহলে কিভাবে বলতে হয়?
-কেনো কখনো গল্প পড়েনি!!
-হ্যা পড়েছি কিন্তু
- কিন্তু মিন্তু কিছু না আচ্ছা আপনাদের বন্ধুত্ব কখন হয় মানে কিভাবে?
আমি মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম। কিন্তু তার মুখে মায়া যেনো আমাকে বিরক্ত হতে দিচ্ছিল না। মেয়েটার কথার ধরন খুব খুব পরিচিত আমার। প্রতিটি কথা যেন মন ছুঁয়ে যায়। তার কন্ঠ স্বর খুবই সুন্দর। যেকেউ খুব সহজেই তার কথার প্রেমে পড়তে বাধ্য। হাহাহা হ্যা আমিও মুগ্ধ।
- কি হলো চুপ কেনো?
- নাহ। শুনুন তাহলে-
সময়টা তখন জুলাই এর শুরু। এস এস সি শেষ করে ইন্টার এ উঠলাম। নতুন কলেজ। সবই অচেনা। নোটিশ বোর্ডে রুম নং দেখে সোজা চলে গেলাম ১০৭ নং রুমে। মোটামুটি ক্লাস স্টুডেন্ট এসেছে। সামনের বেঞ্চ ফাঁকা। বরাবরের মতো সামনেই বসলাম। কিছুক্ষণ পর আরেকটা ছেলে এসে বসলো পাশে।
-আদাব, আমি সিমান্ত। তুই?
-আদিব।
-বাসা কি এইখানেই?
-হ্যা কলেজ থেকে ২০ মিনিট দূরে। তোর?
-নাহ আমি একটু দূরেই। আচ্ছা এইখানে হোস্টেল কোথায় বলতে পারিস
-হ্যা কলেজের পাশের রোড এ সব হোস্টেল।
কথা চলাকালীন সময়ে স্যার ক্লাসে আসলেন। প্রথম ক্লাস পরিচিয় পর্ব। এর পর আস্তে আস্তে ক্লাস পুরো দমে চলতে লাগলো। আমি একটু ইন্ট্রোভার্টেড তাই গত এক মাসে ও বন্ধু বানাতে পারলাম না। আর বেশির ভাগ সময় ফার্স্ট বেঞ্চ এ একা ই বসা হয়।
হঠাৎ একদিন ক্লাস চলাকালীন সময় প্রিন্সিপাল আসলো ক্লাসে।
- তোমাদের সাথে আরেকটা নতুন মেয়ে ভর্তি হয়েছে। আসা করি তোমরা ওর সাথে কোঅপারেট করবে।
ক্লাস টিচার বসতে বললেন। মেয়েদের সাইডে জায়গা না থাকায় আমার পাশেই বসলো।
শুরু তেই আমাদের ম্যাথ ক্লাস। পাশ থেকে ফিস ফিস করে বলল
-ধূর এই ম্যাথ আমার ভালোই লাগে না।
-সসসস_কথা বলো না স্যার শুনলে বোকবে।
-ঢং
ইসসস
ক্লাস থেকে স্যার চলে গেলেন। আমি বললাম
- এবার বলো ম্যাথ কেন ভালো লাগে না?
- ধূর সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যায়
- মনোযোগ না দিলে যা হয়।
আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন আমাকে খেয়ে ফেলবে
- তুই তো খুব বুঝেছিস। আমাকে বুঝাতো
- টিফিন পিরিয়ডে দেখা করো বুঝিয়ে দিবো।
-পারলে এখনই বুঝিয়ে দিতি।
তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে খাতাকলম নিয়ে অঙ্কটা বুঝিয়ে দিলাম।
(পরের ক্লাস শুরু হলো। ম্যাডাম ক্লাশে প্রবেশ করে পড়ানো শুরু করে)
-বাহ তুই তো অনেক ভালো বুঝাতে পারিস। মন্ডল স্যার কে চেঞ্জ করে তোকে
দেয়া উচিৎ
- এক মিনিট তুমি মন্ডল স্যার কে কিভাবে চিনো।
- উনি আমার বাবার বন্ধু।
হঠাৎ করেই এক গর্জন সামনে বসে গল্প করছো কেন?
আমি একটু নম্রস্বরে
-সরি ম্যাডাম
তারপর সারা ক্লাস চুপ ই ছিল।
টিফিন পিরিয়ডের ঘন্টা বাজলো।
এই তোর নামটাই জানা হলো না.
- আমি আদিব।
- আমি মোহনা। তুই অনেক চুপ চাপ স্বভাবের তাইনা?
- হ্যা একটু।
আরে একটু না অনেক। আচ্ছা চল ক্যান্টিন এ। তোদের ক্লাসের মেয়েগুলো আমাকে রেখেই চলে গেল।
ক্লাস থেকে বেরিয়ে মোহনা চিল্লিয়ে উঠলো অর্ক
অর্ক – আরে মোহূ তুই। তুই এই কলেজে ভর্তি হয়েছিস।
মোহনা – হ্যা। বাবার আবার বদলি হলো। তুই এখানে?
- আমরা তো এইখানে শিফ্ট হয়েগেছি ২ বছর হলো।
ওহ তাই তো চিঠির কোনো উত্তর পাইনি।
- আমি তো তোর আগের ঠিকানায় লিখতাম কিন্তু উত্তর পাইনি।
মোহনা বললো এই আদিব এই দিক আয়। অর্ক ও আদিব। আমার ক্লাসের প্রথম বন্ধু। ম্যাথ অনেক ভালো পারে।
অর্ক: হাই। বাহ প্রথম দিনে মোহুর বন্ধু তুমি তো লাকি অনেক।
আদিব: হাই। নাহ ওমন কিছু না
অর্ক: চল ক্যান্টিন এ। আমি তো এই স্কুলেই ছিলাম তোদের কোনো প্রবলেম হলে আমাকে জানাবি।
এইতো এভাবে চলতে থাকলো আমাদের ফ্রেন্ডশীপ। সারাদিন ক্লাস আর মোহনার সাথে গল্প। ক্লাস শেষে প্রাইভেট এ একসাথে যাওয়া মাঝে মাঝে ফাঁকি দিয়ে অর্কের বাসার ছাদে গানের আসর। মোহনা খুব ভালো রান্না করতো। গানের আসর আর ওর হাতের রান্না উফ্।
- এই আপনি খাবেন না? আপনি চাইলে শেয়ার করতে পারি।
- নাহ আপনি খেয়ে নিন। আমি কিছু খাবোনা। রাতে খাই না।
- ওহ ডায়েট?
- হ্যা ঐরকম ই।
-আচ্ছা তার পরে বলেন....
- কোথায় যেন ছিলাম।
- ঐ ঐযে মোহনার রান্না
- ওহ হ্যা... আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল ওরা। ওদের ফ্যামিলির সাথে আমার ও অনেক ভালো সম্পর্ক হয়। মোহনা যেদিন বাসায় রান্না করতো আমাকে আর অর্ক কে আগেই বলে রাখতো।
হাহাহা ওর বলার ধরন ই ছিল অন্য রকম।
কেমন?
প্রতিউত্তরে আমি
ঠিক এই ভাবে শোন তোরা কালকে দুপুরে চলে আসবি আমি রান্না করব। দেখ মজা না হলেও চুপ করে খেয়ে উঠবি। নয়তো তোদের খবর আছে
আর অর্ক বরাবরের মতো বলতো তুই রান্না করে আমাদের উপর এক্সপেরিমেন্ট করিস, ভাই এখনো বিয়ে করিনি আমরা মেরে ফেলিস না আবার।
হাহাহা তখন ই মোহনার গর্জন আর আমাদের দিকে তেড়ে আসা।
- ভালো লাগতো? মোহনা কে?
- আরে নাহ তেমন না আসলে
- আসলে? আসলে কি?
- হয়তো লাগতো
- তাই। কখনো বলেছেন?
- নাহ কখনো হয়নি হয়তো হবেও না
- কেনো হবেনা?
- জানি না।
- আচ্ছা থাক। তারপর বলেন তো ভালোলাগার শুরুটা কিভাবে হলো।
- ২য় বর্ষে যখন উঠলাম। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে অর্ক স্টেজের দায়িত্ব ছিল তাই মোহনাকে নিয়ে আসতে গিয়েছিলাম আমি।
আজ বৃষ্টি হবে খুব মেঘ জমেছে, হালকা শীতল বাতাস। আমি মোহনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ওর অপেক্ষায়। একা একা বিরবির করতে লাগলাম এখন মহারানী এসে বলবে সরি সরি দেরী হয়ে গেল বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছে করে করিনি মা আমাকে দেরী করিয়েছে।
হঠাৎই তার আগমন। আমি না ওকে কখনো এভাবে দেখিনি। আমি খুব চমকে গেলাম। নীল শাড়ি, সাদা ব্লাউজ, এক হাতে অনেকগুলো চুড়ি আর আরেক হাতে আমার দেয়া ঘড়ি। খোঁপা করা চুল আর চুলে শিউলি ফুলের মালা গাঁথা । কজল কালো চোখ আর ঠোঁট এ লিপস্টিক। কেনো জানি এক অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছিল। মোহনার এই রূপ আমাকে তার দিকে আকর্ষণ করছিল। মনে হচ্ছিল যেন সব কিছু থমকে গিয়েছে।
-কিরে যাবি না?
-হ্যা চল
আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি ওর প্রেমে পরেছি।
কলেজর অনুষ্ঠান শেষ। পুরো অনুষ্ঠান এ আমার মনোযোগ শুধু ওর দিকে।
-এই্ আদিব, অর্ক কোথায় রে?
আমার সাথেই ছিলো। স্যার তলব করেছে। আমাদের চলে যেতে বলেছে।
- এই জানিস বট গাছের ঐ জায়গাটায় আরে ঐযে নদীর পাড়ে যেখানে আমরা একবার গিয়েছিলাম মনে আছে তোর?
- আছে রে বাবা তো কি হয়েছে ওখানে?
-জানিস ওখানে মেলা বসেছে।
- হ্যা শুনেছি
- আমাকে নিয়ে যাবি? মা না একদমই ঐদিক যেতে দেয় না আমাকে।
আমাকে নিয়ে যা প্লীজ
- নাহ দরকার নেই। তোর মা নিষেধ করেছে যাওয়ার দরকার নেই।
- আমি এত কিছু বুঝিনা তুই নিয়ে যাবি বলেই মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো।
ওর রাগের প্রেমে পরলাম আমি।
চল মেলায় যাই।
মুখে এক রাশি হাসি নিয়ে বললো
- সত্যি যাবি। মাকে বলিস না আবার। তোর তো আমার মায়ের প্রতি বেশি ভালোবাসা।
- তুমি বুঝবে কিভাবে যার মা নেই সে জানে মায়ের অনুপস্থিতি কতটা দুঃখ দেয়।
মোহনা আমার দিকে তাকিয়ে খুব মায়াভরা চাহনিতে বলল
- আমি ওভাবে বলতে চাইনিরে। রাগ করেছিস। আমার মা তো তোর ও মা।
- ধুর তোমার সাথে কি রাগ করা যায়। চল চল নয়তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
- হ্যা চল
কলেজ থেকে আধ ঘন্টার পথ। গল্প করতে করতে চলে এলাম বটতলা।
মেয়েটা যে এত কথা বলতে পারে। সারা রাস্তা বকবক বকবক আদি জানিস এটা হয়েছে ওটা হয়েছে।
মেলায় ঢুকতেই কোলাহল শুরু। আমি শান্ত পরিবেশ খুব পছন্দ করি।
- চল আদি ভেলপুরি খাই।
- আসতে না আসতেই শুরু করে দিয়েছে উনি
- এমন করিস কেন চল না
- হ্যা চল
মামা ভেলপুরি দাও
ভেলপুরি দেখে বেচারি লোভ সামলাতে পারে না।
- মোহনা বাইস্কোপ দেখবি?
- কোথায়? চল_
ভেলপুরি শেষ করে বাইস্কোপ দেখালাম। এখনতো বাইস্কোপ দেখা যায় না কিন্তু তখন বাইস্কোপ মানেই অন্যরকম অনুভুতি
মোহনা চল তোকে একটা জিনিস কিনে দিবো
- তাই। কি কিনে দিবি
- ঐযে ঐ চুড়ি গুলো তোর হাতে মানাবে
বাববাহ্
কেনাকাটা খাওয়া দাওয়া করতে করতে সন্ধ্যার দিকে মেলা থেকে বের হলাম। বাড়ি ফিরার জন্য মেইন রোড ই বেছে নিলাম। একটা রিকশা নিয়ে চলে গেলাম।
ভাড়া মিটিয়ে ও যখন বাসায় যেতে লাগলো পিছন থেকে ডাক দিলাম।
শোনো তোর জন্য একটা উপহার এনেছি।
আদিব তার হাত বাড়িয়ে মোহনার হাতে একটা ছোট ব্যাগ দিয়ে বলল
- বাড়ি যেয়ে দেখিস।
- আচ্ছা। চলি তাহলে। সাবধানে যাস।
- ঠিক আছে
পরদিন সকালে মোহনা অন্যরকম সাজে কলেজে আসলো।
একটা হালকা গোলাপি রঙের স্কার্ফ তার মধ্যে হালকা কমলা রঙের পাপড়ি।
আমার কাছে এসে বললো
-কিরে তুই কিভাবে বুঝলি
-তোকে ঐ দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই বুঝেছি।
-থ্যাংস। বলে মুচকি হেসে চলে গেল।
এভাবেই দেখতে দেখতে বছর শেষ। আর্ক আমাদের সিনিয়র ছিলো। ওদের বিদায় অনুষ্ঠান। আমরা বৃহস্পতিবার রাতে অর্কর বাসার ছাদে বসতাম। আজ ও বসেছি।
অর্ক – মোহু বিদায় অনুষ্ঠানে ভাষণ দিবিনা।
আদিব – ভাই তোর কি মনে হয় মোহনা ঐখানে ভাষণ দিলে দর্শক কেউ নিজ প্রাণ নিয়ে বাড়ি যেতে পারবে?
মোহনা- ওহ আচ্ছা তাই, আদিব তোকে যদি সেদিন দর্শকদের সাথে না দেখি। আমি জানি তুই সামনে বসবি আর আমাকে ডিস্টার্ব করবি।
অর্ক – আদিব তোর বন্ধু প্রথম বার ভাষণ দিবে ওরে উৎসাহিত কর। ওকে তো চিনি আমি দুই লাইন বলে কান্না করে দিবে।
এভাবেই চলতে থাকে আমাদের খুনসুটি আড্ড।
পরেরদিন সকালে বের হলাম হাঁটতে। শুক্রবার সকালে যেখানে মানুষ নিজের নবাব রূপে রূপান্তরিত হয়ে দীর্ঘ সময় ঘুমের শহরে ঘোরাঘুরি করে সেখানে আমি ভোরবেলা উঠে নদীর তীরে হাঁটতে যাই। আমি শত চেষ্টা করেও দেরী করে উঠতে পারি না। মনে হয় যেন ঘুমের শহরে আমার ঢোকা নিষেধ।
রাস্তর ধার দিয়ে হেঁটে চলেছি। মৃদু হালকা বাতাস বয়ে চলছে। বাতাস যেন আমাকে জরিয়ে ধরে সামনে যেতে কিছুটা বাঁধা দিয়েই চলেছে। এই দুর্বল বাঁধা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাকে যেতেই হবে। কারণ অর্ক আমার আড়ালে মোহনাকে দেখা করতে বলেছিল গতকাল। আর আমি তা বাহির থেকে শুনে ফেলে ছিলাম। কিন্তু খুব ভালো করে শুনতে পারি নি। তাই ভাবলাম যেয়েই দেখি আমার আড়ালে তাঁদের কি এমন কথা।
বাতাস আরো তীব্র হয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে এক রাশি কালো মেঘ তেরে আসছে। অনেকটা রণক্ষেত্রে যেমন ঘোড়া ছুটে। তীব্রতার বুক ছেদ করে তীরে যাওয়া টাই যেনো আমার মূল লক্ষ্য। মাথায় শুধু একটা বিষয়ই ঘোরপাক খাচ্ছে কি এমন কথা যেটা আমার সামনে বলা যায় না। তা বলতে নদীর তীরেই আসতে হবে। তবে কি আমি যা ভাবছি তাই। ঝড় উঠেবে।
রাদু আমি তীরের কাছে যেতে না যেতেই দেখলাম ওদের। দুর থেকে মনে হচ্ছে কত না আকুতিমিনতি করছে অর্ক। কিসের এত মিনতি ওর। আমি কাছে আগাতেই,
- না অর্ক। আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
- কেনো নয়। তুই চাইলেই আমরা এক হতে পারি।
- দেখ তুই জানিস আমি আদিবকে ভালোবাসি আর আদিব ও আমাকে ভালবাসে।
- আদিব তোকে কখনো বলেছে? বলেনিতো
- সব কথা বলার প্রয়োজন হয়না
- তোর বাড়ি থেকে যে বিয়ের তাড়া দিচ্ছে? তুই কি তবে ঐ টেকো মাথার ভুঁড়িওয়ালা কে বিয়ে করবি?
- না করবো না।
- তবে চল আমার সাথে আমরা শহরে পালিয়ে যাই। কেউ খুঁজে পাবে না
- আমি পালাবো না আর পালিয়ে যদি যেতেই হয় তবে তোর সাথে কেন যাবো
আমি কিছুক্ষণ এর জন্যে থমকে গেলাম। ঝড় নামার আগেই যেন আরেক ঝড় শুরু হয়ে গেলো। মোহনার বিয়ে আর আমি জানি না। অনেক রাগ উঠতে লাগলো। অনেক অভিমান ভিড় করতে লাগলো। আর অর্ক ওরে তো নিজের বড় ভাই ভাবতাম। অর্ক তো জানে আমি মোহনা কে কতটা ভালবাসি। তবুও ছিহ।
অর্ক ধমকের স্বরে মোহনা কে বলল
তোর প্রতি আমার নজর অনেক আগে থেকে আর দুদিনের ছেলে এসে তোকে নিয়ে যাবে।
(মোহনা চুল মুষ্টিবদ্ধ করে)
তুই শুধু আমার অন্য কারো হতে দিবো না আমি। তোকে শুধু আমি ভোগ করব।
- (কান্না আর রাগের স্বরে) ছাড় আমায় তুই আমাকে ভোগ করার জন্য আমাকে চাচ্ছিস। আমি মরে যাবো তবু তোর সাথে যাবোনা।
- (শক্ত হাতে গালে চিপ দিয়ে) তবে তুই মর।
এই বলে চুল টেনে নিয়ে যেতে নদীর কিনারায় নিয়ে গেলো। হঠাৎ ঝড় শুরু হলো নদীর পানি ছটফট করতে লাগলো আসেপাশের গাছগুলো অগোছালোভাবে দুলতে লাগলো। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মোহনা শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো অর্কর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। কাঁদা মাটিতে মেখে গেলো তার শরীর। অর্কর এ রূপ দেখে আমি ভীম খেয়ে বসে পরলাম আমার সারা শরীর যেনো অবস হয়ে এলো। চোখে ঝাপসা দেখছি। কাপুরুষের মতো দুর থেকে তাকে দেখছি মাটিতে টেনে হেঁচড়ে হাত পা বেঁধে গলায় কলসি ঝুলিয়ে ফেলে দিলো নদী তে
আমি শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম। হৃদপিন্ডে ধুকধুক শব্দ কানে ঢেকছে মনে হচ্ছে চিৎকার দিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি তবু পারছি না।
হঠাৎ করে আকাশ থেকে এক তীক্ষ্ণ সরু আলো এসে পরলো অর্কর উপর। হ্যা গ্রাম করে শব্দ হলো বাজ পড়লো ওর উপর। নিমিষেই ঝলসে গেল ওর দেহ পরে রইলো মাটিতে।
কিছুক্ষণ পর আমি শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে উঠে চলে যাই বাড়ির দিকে। আজ যা দেখেছি তা বাস্তব না কল্পনা। বাড়িতে যেয়ে দরজা লাগিয়ে যেন
হারিয়ে গেলাম ভিন্ন জগতে। মোহনার স্মৃতি আর অর্কের হিংস্র রূপ আমাকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে। কোথা থেকে যেন মোহনার কন্ঠ ভেসে আসছে বাঁচাও কেউ বাঁচাও, অর্ক আমাকে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে ভাই।
কিছুক্ষণ পর ক্লাসের এক ছেলে এসে আমার খোঁজ করছিলো আমি চোখ মুখ মুছে বের হলাম।
আদিব, অর্ককে নদীর কিনারে পাইছে। ওর উপর বাজ পড়ছে।
শুনে কোনো কিছুই বললাম না। ওর শাস্তি এটা।
-আচ্ছা চল ওর বাসায়।
মোহনার মা মোহনা কে খুঁজতে খুঁজতে অর্কের বাড়িতে আসে। সেখানে অর্ককে নিয়ে যতো কান্নার আসর।
গ্রামের লোকজন মোহনার শরীর ভেসে উঠতে দেখে আর নিয়ে আসে মোহনার বাসায়। আমি দৌড়ে যাই মোহনার বাসায়। ওকে দেখে আমি আর চোখে পানি আটকে রাখতে পারলাম না। তবুও ওর বাবা মা কে শান্ত করার
চেষ্টা করলাম।
আমি সেদিন বলতে পারিনি কে মোহনা কে হত্যা করেছে। তবে দুদিন পর ওর বাড়ি যেয়ে দেখলাম ওনারা নেই। চলে গেছে এ গ্রাম ছেড়ে।
বলতে বলতে চোখ দিয়ে পানি নেমে আসলো।
পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটি রুমাল দিয়ে বলল এই মিথ্যে অশ্রুর সাগরে ভেসে যাওর কোনো মানে নেই।
আমি প্রচন্ড রেগে ওনাকে বললাম
আপনি কি বলছেন? আপনি কিভাবে বুঝবেন চোখের সামনে নিজের প্রিয় জিনিস হারানোর কষ্ট?
কথাটি বলে আমি ওনার দিকে তাকালাম, তার খোলা চুল দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। আর ঘন নিশ্বাস ফেলছে।
মিষ্টি কন্ঠস্বর রূপ নিলো ভয়ানক স্বরে।
-খুব তো বলছিস ভালোবাসতি। তাহলে কাপুরুষের মত সেদিন দুরে থেকে কেন দেখছিলি। বাবা মা আসেপাশের মানুষের তিক্ত কথার কারনে আত্মহত্যা করেছে। আমি নাকি অর্কের সাথে পালিয়ে যাচ্ছিলাম, আমি নাকি নষ্ট মেয়ে।
-কে তুমি
- কেন এখনো চিন্তে পারলি না?
- মোহনা, তুই, কিভাবে।
- সেদিন যখন আমাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তুই কি একটিবার ও আমকে বাঁচানোর জন্য আসলি না। সেদিন আমাকে বাঁচালে বা গ্রামের লোকজন দের সত্যি টা ত্যি টা বললে হয়তো আমার বাবা মা বেঁচে থাকত।
আমি কোনো কথা না বলে শুধু ওর দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ শরীর ঘেমে যাচ্ছে।
আদিব তুই তো আজ ও আমায় ভালোবাসিস তবে আয় আমার কাছে
মোহনা তুই তুই আ. আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি এখনো তোকে ভালবাসি।
তবে আয় আমার কাছে।
আমি ওকে আলিঙ্গন করেলাম আর যেনো মনে সকল ব্যাথা থেকে মুক্তি পাচ্ছে। মনে হচ্ছে শরীর হালকা হয়ে বাতাসে ভেসে যাচ্ছে।
আমার দেহ ট্রেনের সীটে পরে আছে চোখের ভিতরে জানালার গ্রিল ভেঙে অর্ধেক প্রবেশ করে আছে। বুকের মাঝে দিয়ে আরেকটি রড বুক ছেদ করে এপার ওপার হয়েছে। হাতের তালু ছেদ করেছে আরেকটি রড।
নাক মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।(পরেরদিন সকালে নিউজ চ্যানেলে)
গতকাল রাত ২টার দিকে ট্রেন দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু। ট্রেনটির শেষের বগি লাইনচ্যুত হয়ে যায়। বগিতে ৩৪ জন যাত্রীর মধ্যে ২৫ জন সামান্য আহত হয়েছেন এবং বাকি যাত্রীদের অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধার কর্মীরা।